বাংলাদেশের সরকারি ছুটির ক্যালেন্ডারে যুক্ত হচ্ছে একটি নতুন দিন। আগামী বছর থেকে ৫ আগস্ট পালিত হবে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’, যা সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। ফলে ২০২৬ সালে সরকারি ছুটির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২৮ দিন, যা চলতি বছরের তুলনায় একদিন বেশি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, ৫ আগস্টকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন সংক্রান্ত পরিপত্রের ‘ক’ শ্রেণির দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, দিবসটি প্রতি বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে এবং সেদিন সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
২০২৫ সালের ২ জুলাই প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান একটি তাৎপর্যপূর্ণ গণআন্দোলন, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্মরণীয় করে রাখতে এ দিবসকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো।
চলতি (২০২৫) বছরে সরকারি ছুটি ছিল মোট ২৭ দিন যার মধ্যে ১৩ দিন সাধারণ ছুটি এবং ১৪ দিন নির্বাহী আদেশে ছুটি। তবে এর মধ্যে ৯ দিন পড়েছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শুক্র ও শনিবার)।
২০২৬ সালে ছুটি বাড়ছে একদিন। নতুন তালিকায় সাধারণ ও নির্বাহী আদেশ মিলিয়ে মোট ২৮ দিনের ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ দিন উইকডেতে কার্যকর, আর ৯ দিন পড়বে সপ্তাহান্তে।
বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, নতুন বছরে মোট ২৮ দিন সরকারি ছুটি থাকবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সাধারণ ছুটির তালিকায়, যা এবারই প্রথম।
প্রতি বছরই শহীদ দিবস (২১ ফেব্রুয়ারি), স্বাধীনতা দিবস (২৬ মার্চ), মে দিবস (১ মে) ও বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর) সাধারণ ছুটি হিসেবে নির্ধারিত থাকে।
এর সঙ্গে ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারে যুক্ত হচ্ছে ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস, যা জাতীয় স্মৃতির নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), দুর্গাপূজা, বড়দিন ও বৌদ্ধ পূর্ণিমার মতো ধর্মীয় উৎসবগুলোর ছুটিও থাকবে পূর্বের নিয়মে।
সরকারি ছুটি বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মজীবীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি সরকারি ছুটি শুধু বিশ্রামের নয়, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সময়ও বটে। নতুন ছুটি যুক্ত হওয়ায় কর্মীদের মনোবল বাড়বে।
সরকারি কর্মচারী সংগঠনের এক সদস্য বলেন, ৫ আগস্টের ছুটি আমাদের জন্য কেবল বিশ্রামের নয়, এটি জাতীয় ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক। রাষ্ট্র যদি তার অতীত সংগ্রামকে স্মরণ করে, তবেই ভবিষ্যতের প্রজন্ম ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারা সূচনা করে। ওই আন্দোলনকে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে দেখেন অনেক বিশ্লেষক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শামীম আহমেদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে সাধারণ ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল একটি আন্দোলনকে স্মরণ নয় বরং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ও গণআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
তিনি আরও বলেন, এই ছুটি প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেবে যে, রাষ্ট্র কখনো জনগণের ইচ্ছার বাইরে টিকে থাকতে পারে না।
অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারি ছুটি বাড়ায় অর্থনীতিতে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে, তবে এটি সাংস্কৃতিকভাবে ইতিবাচক। কর্মজীবীরা বিশ্রাম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সময় দিতে পারবেন।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানী ড. পারভেজ হাসান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান এখন শুধু রাজনৈতিক ঘটনাই নয়, এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে এটি আমাদের জাতীয় মননে স্থায়ী জায়গা করে নেবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সরকারি ক্যালেন্ডারে ছুটির দিনগুলো আলাদা রঙে চিহ্নিত থাকবে। এছাড়া ধর্মীয় উৎসবভেদে সম্ভাব্য তারিখগুলোও উল্লেখ করা হবে।
প্রথমবারের মতো সরকারি ওয়েবসাইটে ক্যালেন্ডারটি ডিজিটাল ইন্টারেক্টিভ সংস্করণে প্রকাশ করা হবে, যেখানে ব্যবহারকারীরা মাসভিত্তিক ছুটি ও সরকারি কর্মসূচি এক নজরে দেখতে পারবেন।
সরকার মনে করছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে ছুটি ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
৫ আগস্টকে জাতীয় ছুটি হিসেবে যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। এটি কেবল কর্মদিবসের বিরতি নয় বরং স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণআন্দোলনের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রতীকী পদক্ষেপ।
এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারি ছুটির তালিকায় যুক্ত হলো ইতিহাস, ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের নতুন এক দিন।
ইএইচ