ঢাকা শহরের গণপরিবহন খাতে সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প মেট্রোরেল পরিচালনায় যুক্ত কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
রোববার সংস্থাটির পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম খায়রুল আলম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই নির্দেশ জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিএমটিসিএলের মেট্রোরেল ভবন, ডিপো এলাকা, স্টেশন এবং কোম্পানির আওতাধীন সব প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হলো।
একইসঙ্গে ইউনিট প্রধানদের নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
যদিও অফিস আদেশে ছুটি বাতিলের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে সূত্র বলছে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা, যাত্রী চলাচলের ব্যস্ততা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত শঙ্কা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে মেট্রোরেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে কয়েকটি ছোটখাটো দুর্ঘটনা ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাজনিত কয়েকটি ঘটনার পরপরই ডিএমটিসিএল অভ্যন্তরীণভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু করে।
একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমানে যাত্রী চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে একাধিক লাইনে একযোগে সম্প্রসারণকাজ চলছে। তাই মানবসম্পদের পূর্ণ উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ছুটি বাতিলের পাশাপাশি মেট্রোরেল ভবন, ডিপো ও স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা প্রহরী সংখ্যা বাড়ানো, প্রবেশ–নির্গমন পয়েন্টে স্ক্যানিং বাড়ানো এবং রাত্রিকালীন টহল জোরদার করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
অফিস আদেশে ‘বাড়তি সতর্কতা’ শব্দটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্থার সর্বস্তরে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বড় প্রকল্পে নিরাপত্তা ও পরিচালন ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে যুক্তিসঙ্গত।
নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবদুল মজিদ বলেন, মেট্রোরেল একটি উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থা। এখানে সামান্য ত্রুটি বা অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। তাই পুরো টিমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা নিরাপত্তার জন্যই অপরিহার্য।
ডিএমটিসিএলের কয়েকজন কর্মী জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি হঠাৎ আসায় কেউ কেউ অবাক হয়েছেন, তবে তারা একে 'দায়িত্বের অংশ' হিসেবেই দেখছেন।
একজন কর্মী বলেন, ছুটি বাতিল অবশ্যই কষ্টের, কিন্তু যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সিস্টেম সচল রাখাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানি অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং সেল চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে, যাতে জরুরি অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, এটি কেবল অস্থায়ী ব্যবস্থা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে ছুটি ও শিফট রোস্টার আগের অবস্থায় ফিরবে।
রাজধানীর কোটি মানুষের দৈনন্দিন যাত্রায় মেট্রোরেল এখন অপরিহার্য। তাই নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রতিরোধমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে যাত্রী সেবা ও কর্মীদের মনোবল যেন বজায় থাকে সে বিষয়েও নজর দিতে হবে, এমন মত দিয়েছেন নগর বিশ্লেষকরা।
ইএইচ