অনুপ্রেরণা নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ দিগন্ত: রিজওয়ানা হাসান এখন তিন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা

তানজিদ সরওয়ার  প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১১, ২০২৫, ০৯:৪৪ পিএম
  • তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে দৈনিক আমার সংবাদ ও দ্য ডেইলি পোস্টের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক নাম যার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক ন্যায় এবং ন্যায্যতা রক্ষার লড়াই মূলত জড়িয়ে আছে। পরিবেশকর্মী, আইনের পণ্ডিত এবং এখন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপকরূপে তার যাত্রা একটি অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প, যা দেশের নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক ও প্রতিশ্রুতি গড়ে তুলেছে। তার জীবনের গড়ন, সংগ্রাম ও বর্তমান ভূমিকা প্রতিফলিত করে বাংলাদেশে সমৃদ্ধ পরিবেশ এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক তথ্যাধিকার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও অগ্রগতি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ১৫ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে হবিগঞ্জ জেলার নরপতি হাভেলি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই শিক্ষা ও ন্যায় বিচারের প্রতি গভীর আগ্রহ জাগ্রত হয়েছিল। তিনি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং হলি ক্রস কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শিক্ষা নিয়ে বিএসএল (ব্যাচেলর অফ সোশ্যাল ল) ও এলএলএম (মাস্টার অফ ল) ডিগ্রি অর্জন করেন, যেখানে তিনি শ্রেষ্ঠত্বসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেন।

১৯৯৩ সালে আইন পেশায় প্রবেশের পরই রিজওয়ানা বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনে (বেলা) যোগ দেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি 'বেলা'র প্রধান নির্বাহী হয়ে উঠেন এবং পরিবেশ ও মানবিকতা রক্ষার জন্য আইনি লড়াইয়ে নিজেকে নিবেদিত করেন।

তার প্রথম বড় বিষয় ছিল চট্টগ্রাম জাহাজ ভাঙা শিল্প যেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি ছিল ব্যাপক। ২০০৩ সালে তিনি আদালতে মামলা করে জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমকে পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যতিরেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করান। তার এই পদক্ষেপ শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার আইনি ভিত্তিও মজবুত করে।

এই সফল আইনি অগ্রগতি তাকে সমাজের এক পরিচিত 'পরিবেশ বন্ধু' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেতে সাহায্য করে।

রিজওয়ানা হাসানের অসাধারণ পরিবেশ রক্ষার কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসা পেয়েছে।

তিনি গোল্ডম্যান পরিবেশ পুরস্কার (গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্ট প্রাইজ) লাভ করেন ২০০৯ সালে, যা পরিবেশ সংরক্ষণে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ পুরস্কার।

২০১২ সালে তিনি রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কার (রামোন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড) পান তার মানবিক ও পরিবেশসংক্রান্ত নেতৃত্বের জন্য। ২০২২ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ (ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কোরাজে অ্যাওয়ার্ড) এ ভূষিত হন।

এছাড়া তিনি 'টাইম' ম্যাগাজিনের 'হিরোস অফ দ্য এনভায়রনমেন্ট' (পরিবেশের নায়ক) এর তালিকায়ও স্থান পান, যা তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে শপথগ্রহণ করেন এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৬ আগস্ট তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পরিবেশ ও বন-জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে থাকাকালীন তিনি দেশজুড়ে পরিবেশগত নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজ করেছেন, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, বনের সংরক্ষণ, বাতাস ও জলের দূষণ মোকাবিলা ইত্যাদি কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পেয়েছেন। এছাড়াও তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার ফলে তিনি দেশের তথ্য আদান-প্রদানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

রিজওয়ানা ইতিমধ্যেই দেশের গণমাধ্যম ও তথ্য পরিবেশ সম্পর্কে তার দৃঢ় মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন যে উদ্দেশ্যমূলক, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য, এবং একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে মূল চালিকা শক্তি।

এছাড়া তিনি ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ডিসইনফরমেশন মোকাবিলার জন্য তথ্যের সত্যতা ও জন-বিশ্বাস স্থাপনের গুরুত্বও উল্লেখ করেছেন, যা তথ্য ও সম্প্রচারের দায়িত্বে তার নতুন ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

রিজওয়ানা হাসানের সামনে এখন তথ্য ও সম্প্রচার, পরিবেশ, এবং সরকারি প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি, জনসচেতনতা এবং ন্যূনতম তথ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে গণতান্ত্রিক তথ্য পরিবেশ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি, পরিবেশ রক্ষা, জলস্রোত ও বন উন্নয়নের মতো মূল বিষয়গুলোকে দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে নিতে চান তিনি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও উন্নত বাংলাদেশ পান।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের জীবন পেশাগত চেতনা, সমাজসেবা ও সরকারি কাজে নিবেদন একটি অনুপ্রেরণায় ভরপুর উদাহরণ। একদিকে তিনি পরিবেশ রক্ষা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন, অন্যদিকে এখন তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেশের গণতান্ত্রিক তথ্য পরিবেশ গড়ার কাজ করছেন। তার নেতৃত্ব ও অনতিবিলম্বে উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি স্বচ্ছ, তথ্য-সমৃদ্ধ ও পরিবেশ-স্মার্ট জাতিতে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করবে।

ইএইচ