তরুণ ও নারী ভোটারদের সম্পৃক্ত করতে মাঠপর্যায়ে জোরালো প্রচারের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫, ০৮:৪৬ পিএম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন প্রস্তুতি তুঙ্গে, তেমনি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া গণভোট। এই গণভোটকে অর্থবহ, অংশগ্রহণমূলক ও জনমুখী করতে সরকার মাঠপর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছে। 

এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা।

গণভোটে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘ভোটালাপ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত জেলা তথ্য অফিসসমূহের প্রচার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় এসব নির্দেশনা দেন তথ্য সচিব।

সভায় তথ্য সচিব বলেন, গণভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে হলে ভোটারদের শুধু তথ্য জানানোই যথেষ্ট নয়, তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং আস্থা তৈরি করতে হবে। সে লক্ষ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক উঠান বৈঠক হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।

তিনি বলেন, গণভোটকে অর্থবহ ও অনন্য করতে প্রতিটি ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এজন্য জেলা তথ্য অফিসগুলোকে জনগণের একেবারে কাছাকাছি যেতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে, উঠানে বসে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা স্থানীয় সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার মতে, স্থানীয় মানুষের ভাষায়, তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কথা বললে বার্তাটি দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়। তিনি বলেন, আঞ্চলিক ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতি ব্যবহার করে গণভোটের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ভোটের কোনো বিকল্প নেই।

সভায় জানানো হয়, তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের সচেতন ও সক্রিয় করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণযোগাযোগ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবদুল জলিল বলেন, মাঠপর্যায়ে নারী ও তরুণ ভোটারদের নিয়ে নিরলস কাজ চলছে। তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, গণভোটকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ১০টি বিশেষ সংগীত রচনা করা হয়েছে, যা খুব শিগগিরই মাঠপর্যায়ে পরিবেশন করা হবে। এসব সংগীত স্থানীয় শিল্পীদের মাধ্যমে পরিবেশন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সচেতনতামূলক কনটেন্টগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে।

সভায় আরও জানানো হয়, সাধারণ মানুষকে ভোটদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে বিভিন্ন ডেমোস্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কীভাবে ভোট দিতে হবে, কোন বিষয়গুলো মানতে হবে এবং কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে হবে—এসব বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘টেন মিনিট ব্রিফ’ নামক একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তথ্য সচিব। এই কর্মসূচির আওতায় জেলা তথ্য অফিসের কর্মকর্তারা গ্রামীণ বাজার, হাট ও জনসমাগমস্থলে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করবেন। মাত্র দশ মিনিটের এই ব্রিফিংয়ে ভোটারদের কাছে তুলে ধরা হবে গণভোট ও নির্বাচন সংক্রান্ত করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো।

এছাড়া লিফলেট বিতরণ, পোস্টার প্রদর্শন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তথ্য সচিব বলেন, অনেক মানুষ এখনো জানেন না গণভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের কাজ হলো সেই অজানা জায়গাগুলো পরিষ্কার করা।

সভায় গণযোগাযোগ অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সারা দেশের ৬৮টি জেলা তথ্য অফিসের প্রধানরা যুক্ত হন। তারা নিজ নিজ এলাকার প্রচার কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

তথ্য সচিব তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, গণভোট ও নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই আস্থা তৈরি করতে হলে আমাদের কাজ হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জনগণের কল্যাণমুখী।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়ার্ডভিত্তিক উঠান বৈঠক ও সরাসরি জনসংযোগ কার্যক্রম গণভোটে অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছে দিতে এই পদ্ধতি কার্যকর হবে বলে তারা মত দেন।

সব মিলিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো গণভোটকে কেন্দ্র করে যে বিস্তৃত ও বহুমুখী প্রচারণা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার।

ইএইচ