বায়ুদূষণে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ০৫:১৫ পিএম

বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় বারবার ঢাকার নাম উঠে আসা আর বিস্ময়ের নয়, বরং তা আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা ও পরিবেশগত উদাসীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও রাজধানী ঢাকা আজ বায়ু দূষণের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক নগরীতে পরিণত হয়েছে। এই দূষণ কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি জাতীয় সংকট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মান অনুযায়ী, বাতাসে ক্ষতিকর কণার (বিশেষ করে পিএম২.৫ ও পিএম১০) মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে না থাকলে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। ঢাকার বাতাসে এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি প্রায় সারা বছরই গ্রহণযোগ্য মাত্রার বহু গুণ বেশি থাকে। শীত মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ু দূষণের কারণে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শুধু তাই নয়, গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে দূষিত বাতাস ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করছে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অদৃশ্য বিপদ।

ঢাকার বায়ু দূষণের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন। জনসংখ্যার চাপ সামলাতে না পেরে শহরটি আজ কার্যত একটি কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। খোলা মাঠ, জলাশয় ও সবুজ অঞ্চল দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে বাতাস বিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বড় কারণ হলো যানবাহনের ধোঁয়া। পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন, নিম্নমানের জ্বালানি এবং যানজট এই তিনের সম্মিলিত প্রভাব ঢাকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত বাস ও ট্রাক থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তৃতীয়ত, ইটভাটা ঢাকার বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। রাজধানীর আশপাশে অবস্থিত শত শত ইটভাটা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ধুলিকণা সরাসরি ঢাকার বাতাসে মিশে দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধুলা, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানো এবং বৃক্ষনিধনও বায়ু দূষণকে তীব্রতর করছে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন রয়েছে, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালাও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ। পরিবেশ অধিদপ্তর প্রায়ই অভিযান চালালেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সাময়িক ও প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রভাবশালী শিল্পকারখানা বা ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও স্বার্থান্বেষী মহলের চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফলে আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার সুফল নাগরিকরা খুব কমই পান। পরিবেশ দূষণ যেন এক ধরনের ‘স্বাভাবিক বাস্তবতা’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে—যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ঢাকার বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। এটি কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ, সড়ক পরিবহন, শিল্প, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় সরকার—সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

প্রথমত, যানবাহন খাতে সংস্কার জরুরি। পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন ধাপে ধাপে তুলে দিতে হবে। গণপরিবহনব্যবস্থা আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে হবে। বৈদ্যুতিক বাস ও ব্যক্তিগত ইভি ব্যবহারে প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে না পারলে যানজট কমবে না, দূষণও কমবে না।

দ্বিতীয়ত, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। রাজধানীর আশপাশ থেকে অবৈধ ও পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ব্লক ও আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, নগর পরিকল্পনায় সবুজায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট হারে সবুজ এলাকা রাখার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তার পাশে, খালি জমিতে ও ভবনের ছাদে গাছ লাগানোকে উৎসাহিত করতে হবে।

চতুর্থত, শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। যে শিল্প পরিবেশ আইন মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে আপসহীন ব্যবস্থা নিতে হবে সে যত বড়ই হোক না কেন।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা অনেক সময় নিজেরাই বায়ু দূষণের অংশীদার হয়ে উঠি—খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, অপ্রয়োজনীয় গাড়ি ব্যবহার, নির্মাণকাজে নিয়ম না মানা এসবের মাধ্যমে। পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে, গণমাধ্যমকে নিয়মিতভাবে বায়ু দূষণের ঝুঁকি ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সচেতন নাগরিক চাপই পারে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে।

আজ যদি আমরা ঢাকার বায়ু দূষণ নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। উন্নয়নের নামে যদি আমরা বসবাসের অযোগ্য একটি শহর তাদের হাতে তুলে দিই, তবে সেই উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।

ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের হৃদয়। এই হৃদয় যদি বিষাক্ত বাতাসে আক্রান্ত থাকে, তাহলে পুরো দেশই অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণকে আর বিলাসিতা বা গৌণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জীবন-মরণের প্রশ্ন।

বিশ্বে বায়ু দূষণে ঢাকার শীর্ষে থাকা আমাদের জন্য লজ্জার, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনও সময় আছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা ও নাগরিক সচেতনতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ঢাকাকে আবারও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।

জেএইচআর