বাংলাদেশ যে অলি-আউলিয়া ও সুফি-সাধকদের পুণ্যভূমি, সেই ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, মাজারে হামলা বা ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কোনো স্থাপনায় আঘাত করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ এবং এ ধরনের উগ্রতা এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিপন্থী।
শুক্রবার সকালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সানোড়া ইউনিয়নের বাটুলিয়া এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বুচাই পাগলার মাজার পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একদল দুর্বৃত্ত মাজারটি ভেঙে দেওয়ার পর সম্প্রতি এটি সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার পরবর্তী অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেই প্রেস সচিবের এ সফর।
মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেওয়ার পর শফিকুল আলম উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি অনন্য দেশ যেখানে ইসলাম সম্প্রসারিত হয়েছে পীর-মাশায়েখ ও অলি-আউলিয়াদের হাত ধরে। মাজারে মানুষের আসা-যাওয়া বা বিশ্বাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু কারও যদি পছন্দ না হয়, তিনি সেখানে না আসাই শ্রেয়। তবে তাই বলে মাজারে আঘাত বা ভাঙচুর করা হবে, এটা কোনো সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না।
তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থান এ দেশের শক্তির জায়গা। সরকার এ সম্প্রীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং যারা এ শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ধামরাইয়ের এ প্রাচীন মাজারটি স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে মাজার সংলগ্ন স্থানে বাউলগানের মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তবে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একদল উগ্রবাদী ব্যক্তি মাজারটিতে অতর্কিত হামলা চালায় এবং ব্যাপক ভাঙচুর করে।
এ ঘটনার পর আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি আদালত ধামরাই থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে পুলিশ বাদী হয়ে দুইজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করে। তবে মামলার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শফিকুল আলম এ প্রসঙ্গে জানান, সরকারিভাবে এ বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ও সুফি দরগাহে হামলার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পরবর্তী ৫ মাস ২০ দিনে সারা দেশে মোট ৪০টি মাজার এবং দরগাহে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে যেখানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছিল।
প্রেস সচিব জানান, প্রতিটি হামলার ঘটনায় সরকার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এ পর্যন্ত ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে। মাজার পরিদর্শনের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি ও প্রস্তাবিত গণভোটের বিষয়েও কথা বলেন শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা চায়। তিনি বলেন, জনগণ জানে, তারা যদি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রায় দেয়, তবে দেশে আর গুম, খুন বা লুটপাটের রাজনীতি ফিরে আসবে না। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে ব্যাংকের টাকা কেউ চুরি করতে পারবে না, কোনো ছোট ভাই বোন বা বাবা মাকে গুম করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের অধিকার সমুন্নত রাখার সুযোগ পাবে। একটি বৈষম্যহীন এবং অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা উপহার দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য। পরিদর্শনকালে প্রেস সচিবের সাথে উপস্থিত ছিলেন, ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ সালমান হাবীব এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিদওয়ান আহমেদসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মাজার কমিটির পক্ষ থেকে বুচাই পাগলার মাজারের নিরাপত্তা ও বাউল মেলার আয়োজন নির্বিঘ্ন করার দাবি জানানো হয়।