মুছাব্বির হত্যার নেপথ্যে যা ছিল

বিদেশের ছক, ভাড়াটে শুটার ও কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় গত ৭ জানুয়ারি রাতে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যার চূড়ান্ত আদেশ এসেছিল দেশের বাইরে থেকে। ডিবির তদন্ত বলছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড হলেন দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসী দীলিপ ওরফে বিনাশ। মূলত আধিপত্য বিস্তার এবং কারওয়ান বাজার এলাকার চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ নিতেই মুছাব্বিরকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

নরসিংদীতে ডিবির অভিযান, দ্বিতীয় শুটার গ্রেপ্তার মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দ্বিতীয় শুটার আবদুর রহিমকে গতকাল শুক্রবার ভোরে নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। আজ শনিবার সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। 

রহিমের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অত্যন্ত উন্নত মানের দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে জিন্নাত নামের আরেক শুটারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভি ফুটেজে এই দুজনকেই মোটরসাইকেলে এসে গুলি করতে দেখা গেছে।

বিদেশের রিমোট কন্ট্রোল, শীর্ষ সন্ত্রাসী দীলিপের নির্দেশ ডিবির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য। দীর্ঘ দিন ধরে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী দীলিপ ওরফে বিনাশ বর্তমানে বিদেশের মাটিতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও এলাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

মুছাব্বির যেহেতু স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ছিলেন এবং চাঁদাবাজির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই দীলিপ তাঁর গ্যাংয়ের সদস্যদের মুছাব্বিরকে শেষ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। গ্রেপ্তারকৃত শুটাররা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই মিশন সম্পন্ন করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

কারওয়ান বাজারের সিন্ডিকেট ও ৮ থেকে ৯টি গ্রুপ সংবাদ সম্মেলনে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, কারওয়ান বাজার এলাকায় বর্তমানে ছোট-বড় ৮ থেকে ৯টি গ্রুপ নামে-বেনামে নিয়মিত চাঁদা তুলছে। সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী, সবাইকে এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকতে হয়। এই গ্রুপগুলো বিদেশের ডনদের নাম ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত করে রাখে। মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর এই সিন্ডিকেটের মধ্যে বড় ধরনের রদবদলের চেষ্টা চলছিল। 

পুলিশ জানিয়েছে, এই চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়ার জন্য সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

রাজনীতির চেয়ে অপরাধই যেখানে বড় পরিচয় হত্যাকারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের কোনো আদর্শ বা দল নেই। তারা স্রেফ নিজেদের স্বার্থে যখন যে দল শক্তিশালী থাকে, তাদের ছত্রছায়ায় যাওয়ার চেষ্টা করে। 

গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন চাঁদাবাজ গ্রুপের নাম বললেও কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার কথা স্বীকার করেনি।

সেই কালরাত, যেভাবে খুন হন মুছাব্বির গত ৭ জানুয়ারি রাত আটটার দিকে পশ্চিম তেজতুরী পাড়ার হোটেল সুপার স্টারের পাশের গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন মুছাব্বির। সঙ্গে ছিলেন তেজগাঁও থানার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ। হঠাৎ মোটরসাইকেলে আসা দুই আততায়ী তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। মুছাব্বির ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং মাসুদ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

আজিজুর রহমান মুছাব্বির কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি তেজগাঁও এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও শোকের ছায়া নেমে আসে।

মামলার বর্তমান অবস্থা মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের দায়ের করা মামলায় এ পর্যন্ত মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন রহিম, জিন্নাত, আব্দুল কাদের, রিয়াজ ও বিলাল। এদের মধ্যে একজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, যেখানে এই হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত এবং দীলিপের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ রয়েছে। 

তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুটার রহিমকে গ্রেপ্তারের ফলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা আরও কিছু রাঘববোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশের বাইরে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী দীলিপকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ভাবছে পুলিশ।

জেএইচআর