অনুমতি ছাড়া ভিডিও করায় সাংবাদিককে হেনস্তা করে বসলেন তরুণী এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চত্বরে শব্দদূষণবিরোধী মোবাইল কোর্ট চলাকালীন স্টার নিউজের ক্যামেরাপারসনসহ বাংলাদেশ প্রতিদিন ও অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক তরুণীর তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটির মধ্যে তরুণী ক্যামেরা ধরে টান দেন। এতে ক্যামেরাপারসনের গায়েও আঘাত লাগে।
তরুণীর অভিযোগ, তার অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে আইন কী বলে তা জেনে নিই
বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে কারো সম্মতি ছাড়া তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করা বেআইনি। এটি গোপনীয়তার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এর ফলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের মতো আইনি পরিণতি হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ অনুযায়ী কারো সম্মতি ছাড়া তার ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ আইনে সোশ্যাল মিডিয়াও অন্তর্ভুক্ত। এতে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। অন্যদের গোপনীয়তাকে সম্মান করা এবং কোনো ফটো বা ভিডিও ধারণ বা শেয়ার করার আগে সম্মতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি সাংবাদিকরাও ভিডিও ধারণ করতে পারবেন না? বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো আইন সাংবাদিকদেরকে অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও করার সরাসরি অধিকার দেয় না। তবে কিছু আইনি ভিত্তি আছে যার মাধ্যমে সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ছবি বা ভিডিও করতে পারেন।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা স্বীকৃত। এর অর্থ, সাংবাদিকরা সত্য ও তথ্য জানার এবং প্রকাশ করার অধিকার রাখেন। তবে এই অধিকার সম্পূর্ণ অবাধ নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে সরকার এই অধিকার সীমাবদ্ধ করতে পারে।
তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী জনগণের তথ্য জানার অধিকার আছে। সাংবাদিকরা জনস্বার্থে তথ্য চাইতে পারেন। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাস্তবে সাংবাদিকরা পাবলিক জায়গায় যেমন রাস্তা, বাজার বা পার্ক, যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যুক্তি খাটে না সেখানে অনুমতি ছাড়াই ছবি বা ভিডিও করতে পারেন।
শাহজালাল বিমানবন্দর চত্বরে শব্দদূষণবিরোধী মোবাইল কোর্ট চলাকালীন ঘটনাটি ঘটেছে রাস্তার পাশে। স্টার নিউজের ক্যামেরাপারসন তখন রাস্তায় ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় একটি গাড়ির ভেতর থেকে তরুণী নেমে এসে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
সরকারি অফিস, হাসপাতাল, সংরক্ষিত স্থান, সেনা এলাকা ও আদালতে অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও বৈধ নয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গা যেমন বাড়ি, দোকান বা কারখানা মালিকের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা ছবি ও ভিডিও করা অবৈধ প্রবেশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হাসপাতালের ক্ষেত্রে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থা ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয়। রোগী বা তার পরিবার বা অভিভাবকের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও করা আইন লঙ্ঘন।
বাংলাদেশে ডাক্তার ও রোগীর গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালের ভেতরে কাজ করতে চাইলে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন। জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ বা সিসিইউ এর মতো স্পর্শকাতর স্থানে এটি সাধারণত পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও গোপনীয়তা আইনের অধীনে অনুমতি ছাড়া রোগীর ছবি বা ভিডিও করলে জরিমানা ও কারাদণ্ড হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কেউ চাইলে সাংবাদিক বা মিডিয়া হাউজের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। হাসপাতালের ভেতরে সাংবাদিক ছবি বা ভিডিও করতে পারবেন যদি কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকে অথবা সংশ্লিষ্ট রোগী বা তার পরিবারের সম্মতি থাকে, নইলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ইএইচ