মাথার ওপর স্থায়ী আশ্রয় হারানোর শঙ্কা, সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে আজিমপুর সরকারি কলোনির (জোন-সি) ৪১৮টি সরকারি চাকরিজীবী পরিবার। তাদের অভিযোগ, একনেকের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একক ও ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনর্বাসনের কোনো নিশ্চয়তা না দিয়েই ভবন নির্মাণ ও ভাঙার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
সোমবার মগবাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সি-জোনের ৪০/পি ভবনের বাসিন্দা শামসুন্নাহার বলেন, “আমরা সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারী। কেউ সচিবালয়ে, কেউ আদালতে, কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছি। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এখানে বসবাস করছি। আমাদের পরিবার, সন্তানদের শিক্ষা এবং জীবনের সব স্বপ্ন এই জায়গাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।”
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য বাসিন্দাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—মুশফিকুর রহমান, শহিদুল ইসলাম, নাজমুল ইসলাম (এলওটি ৩৯), সাইফুল ইসলাম (৩২ নম্বর), মুক্তাদির হোসেন (৪০ নম্বর পুরাতন ভবন), নাজমুন নাহার (২৪ এলওটি), রীমি আক্তার (২৫ এলওটি) প্রমুখ।
বাসিন্দারা জানান, তাদের সন্তানরা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন স্কুল, বুয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ইডেন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। হঠাৎ করে আবাসন ভাঙার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে একের পর এক দরপত্র আহ্বান করা হলেও আজ পর্যন্ত কাউকেই বিকল্প বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনের সভায় একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্প শুরুর আগে বর্তমান বাসিন্দাদের জোন-বি এলাকায় পুনর্বাসনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বরং মৌখিকভাবে নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে, যা পরিবারগুলোর কাছে চরম উদ্বেগ ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া এক অভিভাবক বলেন, “আমরা কেউ অবৈধ দখলদার নই। রাষ্ট্রের চাকরি করে সরকারি নিয়মে বসবাস করছি। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ হলে আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া, নিরাপত্তা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।”
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন ও লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন। মানবিক সমাধানের জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন যার মধ্যে যে কোন এক বাস্তবায়নের দাবি জানান। প্রস্তাবনাগুলো হল-১. একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জোন-বিতে পুনর্বাসন। ২. জোন-এ’র নবনির্মিত ভবনে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর। ৩. আজিমপুরের অন্যান্য প্রকল্পের মতো দুই ধাপে জোন-সি প্রকল্প বাস্তবায়ন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একক সিদ্ধান্তে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে শামসুন্নাহার বলেন, “রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রেখেই আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মানবিক সমাধান চাই।” বাসিন্দারা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শামসুন্নাহার জানান, “মাসখানেক আগে ৩১টি ভবন ভাঙার নোটিশ দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তবে ভাঙার আগে কোথায় আমরা যাব, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। ভবনগুলো ভেঙে আধুনিক স্থাপনা গড়ে তোলার আগে অন্তত মাথা গোঁজার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”
এএন