রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জনমনে স্বস্তি ফেরাতে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে ধরা পড়েছে দীর্ঘদিনের পলাতক ও তালিকাভুক্ত হত্যা মামলার প্রধান আসামি শাওন (২৩)।
বৃহস্পতিবার ভোরে মোহাম্মদপুরের বসিলা ক্যাম্পের সেনাসদস্যরা চাঁদ উদ্যান ও শোনা মিয়ার টেক এলাকায় এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে শাওনের চার সহযোগীসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পেট্রোল বোমা, শটগানের গুলি এবং বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য।
গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। ভিডিওটিতে দেখা যায়, জনাকীর্ণ স্থানে প্রকাশ্যে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করছে এক যুবক। সেই যুবকই হলো এই শাওন। সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে শাওনকে আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সে পলাতক ছিল। এর আগে একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলেও সে সুকৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোরে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে জালে তোলা সম্ভব হলো।
সেনাবাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজন হলেন—শাওন (২৩), যিনি একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি এবং কিশোর গ্যাং বা অপরাধী চক্রের মূল হোতা; আনোয়ার (২৫), শাওনের প্রধান সহযোগী; পাশাপাশি শাকিল (২৩), শুভ (২০) ও বেলাল (৩৬), যারা চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে জড়িত ছিলেন।
গ্রেপ্তারকৃতদের আস্তানা থেকে রীতিমতো যুদ্ধের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। যা দেখে বোঝা যায়, তারা কেবল একটি খুনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এলাকায় বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
জব্দকৃত তালিকায় রয়েছে—৮টি তাজা পেট্রোল বোমা, ৫ রাউন্ড শটগানের তাজা গুলি, ১টি ধারালো চাইনিজ ছুরি, ৮টি বড় সামুরাই, ৫টি চাপাতি ও ১টি রামদা। এছাড়া মাদকদ্রব্যের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৬১টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৫ গ্রাম আলগা ইয়াবা, ৪৭৫ গ্রাম গাঁজা ও ৬০ পুরিয়া গাঁজা। অন্যান্য আলামতের মধ্যে রয়েছে মাদক পরিমাপের একটি ওজন মেশিন, ৪টি মোবাইল ফোন এবং ৫৮টি রহস্যময় বিদেশি কয়েন।
অভিযান শেষে সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শাওন গত বছর দিবালোকে যে নৃসংসতা চালিয়েছিল, তা আমাদের নজরে ছিল। অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গতরাতের অভিযানটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। আমরা কেবল খুনিকে ধরিনি, তার অস্ত্রভাণ্ডারও ধ্বংস করে দিয়েছি। ‘তিনি আরও জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপরাধী চক্র নির্মূল করতে সেনাবাহিনীর এ ধরনের কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও বসিলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ছিল। বিশেষ করে শাওনের মতো দুর্ধর্ষ খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোয় এলাকাবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। সেনাবাহিনীর এই সফল অভিযানের পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা দাবি জানিয়েছেন, যেন এই অপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং তারা যেন জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় এলাকায় তান্ডব চালাতে না পারে।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনকে জব্দকৃত মালামালসহ মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ছাড়াও অস্ত্র ও মাদক আইনে নতুন করে মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে তাদের অন্য সহযোগীদের অবস্থান সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করবে।
মোহাম্মদপুরে সেনাবাহিনীর এই অভিযান ঢাকার অপরাধ জগতের জন্য একটি শক্ত বার্তা। বিশেষ করে যারা কিশোর গ্যাং বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খুনের মতো অপরাধ করে লুকিয়ে থাকে, তাদের জন্য শাওনের গ্রেপ্তারি একটি বড় শিক্ষা। প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা বজায় থাকলে রাজধানীকে সন্ত্রাসমুক্ত করা সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এএন