ভোরের আজিমপুরে প্রাণ কাড়ল ঘাতক ট্রাক

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। জীবিকার তাগিদে রিকশার প্যাডেল চেপে রাজপথে নেমেছিলেন ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আমজাদ হোসেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই যাত্রাই তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াল। 

শুক্রবার ভোরে রাজধানীর আজিমপুর এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এই ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক।

যেভাবে ঘটল সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমজাদ হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তেজকুনিপাড়ার বাসা থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন। সারা রাত রিকশা চালিয়ে ভোরের দিকে তিনি আজিমপুর এতিমখানা এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাঁর রিকশাটি একটি সড়ক বিভাজকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ধাক্কায় তিনি ছিটকে রাস্তার ওপর পড়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ট্রাক তাঁকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে তাঁর দেহ রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে থাকে রাজপথে।

ছেলের আর্তনাদ ও শেষ দেখা, নিহত আমজাদ হোসেনের ছেলে সাকিব হোসেনের বর্ণনায় উঠে আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো বাবা রাতে কাজে বেরিয়েছিলেন। ভোরে পুলিশের ফোন পেয়ে যখন তিনি আজিমপুর এতিমখানা এলাকায় পৌঁছান, তখন দেখেন তাঁর বাবা নিথর দেহে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। সাকিব বলেন, বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করেছেন। এই বয়সেও তিনি রিকশা চালাতেন যাতে আমাদের কষ্ট না হয়। সেই বাবাকে এভাবে রাস্তার ওপর মরে পড়ে থাকতে দেখব, তা কখনো কল্পনাও করিনি।

চিকিৎসক ও পুলিশের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় সাকিব তাঁর বাবাকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সকাল পৌনে ৭টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা, নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. ফারুক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আমজাদ হোসেনের মরদেহ বর্তমানে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর তা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বিষয়টি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট লালবাগ থানাকে অবহিত করা হয়েছে। ঘাতক ট্রাকটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

পরিচয় ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট, নিহত আমজাদ হোসেন ঢাকা জেলার দোহার থানার জৈনকি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তবে দীর্ঘকাল ধরে তিনি সপরিবার রাজধানীর ফার্মগেট সংলগ্ন তেজকুনিপাড়ায় বসবাস করে আসছিলেন। দুই ছেলের বাবা আমজাদ ছিলেন পরিবারের অন্যতম ভরসা। তাঁর মৃত্যুতে পুরো তেজকুনিপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত আমজাদ হোসেনের বয়স ছিল ৬০ বছর এবং তিনি পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ছিলেন। আজিমপুর এতিমখানা এলাকায় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা লেগে পড়ার পর ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা দোহার, ঢাকা।

রাজধানীতে অনিয়ন্ত্রিত ট্রাকের দাপট: জনমনে প্রশ্ন, ভোরের আলো ফোটার আগে রাজধানীর সড়কগুলোতে ট্রাক ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর ফলে প্রতিনিয়তই আমজাদ হোসেনের মতো সাধারণ শ্রমিক ও পথচারীদের প্রাণ দিতে হচ্ছে। আজিমপুরের এই ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, ভোরের ঢাকা কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিরাপত্তা এবং বড় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর তদারকি জরুরি বলে মনে করছেন সাধারণ নাগরিকরা।

শোকাতুর পরিবার ও বিচারের দাবি, একটু স্বচ্ছলতার আশায় রিকশা নিয়ে বের হওয়া মানুষটি এখন নিথর দেহে মর্গের শীতল ঘরে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সাকিব ও তাঁর পরিবার। ঘাতক ট্রাকটিকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।

জেএইচআর