রাজধানীর কামারপাড়ায় অগ্নিকাণ্ড: গ্যাস বিস্ফোরণে বিপর্যস্ত দুই পরিবার

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

যখন সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই উত্তরার কামারপাড়া এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। রান্নার গ্যাসের পাইপলাইনে থাকা সূক্ষ্ম একটি লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাস স্পার্কের সংস্পর্শে আসতেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘরের আসবাবপত্র লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। এই ঘটনায় শিশু ও নারীসহ মোট ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন।

হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, দগ্ধদের মধ্যে দুটি পরিবারের ছয়জন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ বছর বয়সী ফুটফুটে শিশু রোজার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। শিশুদের কোমল শরীরে আগুনের আঁচ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা বার্ন ইউনিটের করিডোরে স্বজনদের আর্তনাদ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন সোনিয়া আক্তার নামের এক নারী। 

চিকিৎসকদের মতে, তাঁর দেহের ১০০ শতাংশই পুড়ে গেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় শতভাগ দগ্ধ হওয়া রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া দগ্ধ অন্য ৯ জনের অবস্থাও স্থিতিশীল নয় বলে জানা গেছে।

শুক্রবার ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বাসার ভেতরে দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাসের পাইপলাইন থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল। 

বদ্ধ ঘরে রাতভর গ্যাস জমে থাকায় বাতাস হয়ে উঠেছিল বিস্ফোরক। ভোরে পরিবারের কেউ হয়তো চুলা জ্বালাতে গিয়েছিলেন অথবা বিদ্যুতের কোনো সুইচ অন করেছিলেন। সামান্য সেই আগুনের কণা বা ইলেকট্রিক স্পার্কই মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরকে একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত করে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

আগুনের ভয়াবহতা দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও সাহসিকতার সাথে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই স্থানীয়রা দগ্ধদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। দগ্ধ ১০ জনকেই সরাসরি শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।

কামারপাড়ার এই দুর্ঘটনা আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রাজধানীর গ্যাস পাইপলাইনগুলোর জরাজীর্ণ দশা। প্রতি বছরই শীত বা বর্ষার সন্ধিক্ষণে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, ঝরে যায় অসংখ্য প্রাণ। 

বিস্ফোরণের কারণ বিশ্লেষণে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে সেগুলো হলো পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ বা পুরনো হয়ে যাওয়া পাইপলাইনের সংস্কার না করা, অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিয়ম বহির্ভূত অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং সচেতনতার অভাব। ঘরে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলেও অনেক সময় বাসিন্দারা সেটিকে গুরুত্ব দেন না যা এমন দুর্ঘটনা ডেকে আনে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধদের মধ্যে অধিকাংশেরই শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে শরীরের বাইরের অংশের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গ পুড়ে যাওয়াটা রোগীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। 

বিশেষ করে শিশু রোজার বয়স কম হওয়ায় তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। সোনিয়া আক্তারের শতভাগ দগ্ধ হওয়ার বিষয়টি পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই ভাবিয়ে তুলছে। কামারপাড়ার এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে যে, ঘরের নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ১০ জন মানুষের আর্তনাদে আজ রাজধানীর বাতাস ভারী। দুটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কাঁচের দেয়ালের ভেতরে বন্দি।

সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে রাজধানীর প্রতিটি এলাকার পাইপলাইন পরীক্ষা করা। অন্যথায়, কামারপাড়ার মতো শোকাবহ ঘটনা বারবার আমাদের সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে থাকবে। জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ঘরে গ্যাসের গন্ধ পেলে কোনোভাবেই ম্যাচের কাঠি বা লাইটার জ্বালাবেন না। ইলেকট্রিক কোনো ডিভাইসের সুইচ যেমন ফ্যান বা লাইট অন বা অফ করবেন না। 

দ্রুত ঘরের সব দরজা ও জানালা খুলে দিন এবং বাসার প্রধান গ্যাস সংযোগ ভালভ বন্ধ করে দিন। সেই সাথে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস বা গ্যাস বিতরণ সংস্থাকে খবর দিন। ১০ জন মানুষের সুস্থতা কামনায় এখন পুরো দেশ প্রতীক্ষায় রয়েছে।

জেএইচআর