বদলে যাচ্ছে ঢাকা 

উচ্ছেদ অভিযানে ফুটপাত দখলমুক্ত, স্বস্তিতে পথচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০১:৪২ পিএম
রাজধানীর ফুটপাতে চৌকি নিয়ে বসে ব্যবসা করা চৌকি গুলো পিকআপ ভ্যানে উঠানো হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা শহরের দীর্ঘদিনের প্রধান অভিশাপ ছিল ফুটপাত দখল এবং এর ফলে সৃষ্ট অসহনীয় যানজট। বিশেষ করে ঢাকা শহরের দীর্ঘদিনের প্রধান অভিশাপ ছিল ফুটপাত দখল এবং এর ফলে সৃষ্ট অসহনীয় যানজট। বিশেষ করে নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত দিয়ে হাঁটা ছিল এক প্রকার দুঃসাধ্য কাজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের কঠোর উচ্ছেদ অভিযানে বদলে গেছে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তার চিত্র। রাজধানী ঢাকার চিরচেনা রূপ মানেই যানজট, মানুষের ঠাসাঠাসি ভিড় আর ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট। 

বিশেষ করে নিউমার্কেট, মিরপুর রোড এবং সায়েন্স ল্যাব সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ফুটপাত বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের প্রশাসনের নিরবচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে বদলে গেছে রাজধানীর দৃশ্যপট। যে নিউমার্কেটের রাস্তায় এক পা বাড়ানো কঠিন ছিল, সেখানে এখন শৃঙ্খলা ফিরেছে। উধাও হয়েছে দীর্ঘদিনের যানজট, আর সাধারণ মানুষ ফিরে পেয়েছে তাদের হাঁটার অধিকার।

বুধবার সরেজমিনে নিউমার্কেট ও সংলগ্ন গাউছিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই ধারের ফুটপাতে কোনো হকার নেই। এর আগে যেখানে জামাকাপড়, জুতো আর প্রসাধনীর পসরা বসিয়ে ফুটপাত পুরোপুরি আটকে রাখা হতো, সেখানে এখন পথচারীরা স্বচ্ছন্দে চলাচল করছেন। উচ্ছেদ অভিযানের ফলে রাস্তা চওড়া হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে যানজটের ওপর। আগে মিরপুর রোড থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত যে জট সৃষ্টি হতো, তার প্রধান কারণ ছিল রাস্তার ওপর হকারদের দখলদারি। এখন গাড়িগুলো অনায়াসেই চলাচল করতে পারছে।‘পথচারীদের প্রতিক্রিয়া ও স্বস্তি‘

ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি সাধারণ পথচারীরা। দৈনিক আমার সংবাদ-এর সাথে আলাপকালে পথচারী সেলিম আহমেদ তার স্বস্তির কথা জানান। তিনি বলেন, সরকার সত্যিই একটি কঠিন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। এর জন্য আমি সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আগে মেইন রোড দিয়ে আমাদের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হতো, কারণ ফুটপাতে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। এখন রাস্তাটি কত সুন্দর লাগছে! মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে।

তিনি আরও যোগ করেন, এই পরিবর্তন শুধু কয়েক দিনের জন্য হলে হবে না। এটা সবসময় বজায় রাখতে হবে। হকাররা যাতে আবার ফিরে এসে বসতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর সজাগ থাকতে হবে। তাহলেই দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া সম্ভব।

আরেকজন নিয়মিত পথচারী বলেন, মেইন রোড দিয়ে হাঁটতে গেলে সবসময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাফেরা করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। এখন ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পেরে আমরা নিরাপদ বোধ করছি। তবে আমাদের দাবি, এই অভিযান যেন শুধু নিউমার্কেটে সীমাবদ্ধ না থাকে।‘দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনের ভূমিকা‘

ঢাকায় এর আগেও বহুবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হকাররা পুনরায় ফুটপাত দখল করে নেয়। এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলা বন্ধ করাই এখন প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কেবল উচ্ছেদের বিষয় নয়, এটি নিয়মিত তদারকির বিষয়।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার তারা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। নিয়মিত টহল এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে অভিযানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যেন ফুটপাতগুলো আর আগের অবস্থায় ফিরে না যায়। তবে এজন্য সাধারণ জনগণের সহযোগিতা এবং জনমত গঠনও অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু নিউমার্কেট বা মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় উচ্ছেদ চালালে হবে না। ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের যেখানেই ফুটপাত দখল হয়েছে, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করতে হবে। গাবতলী, মহাখালী, গুলিস্তান এবং মিরপুরের মতো এলাকাগুলোতেও যদি এভাবে উচ্ছেদ চালানো হয়, তবেই ঢাকা একটি সত্যিকারের আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে উঠবে।

একটি আধুনিক ও স্বপ্নের শহর গড়ে তোলা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। জনগণের সচেতনতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হকারদের কাছ থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পণ্য কেনা বন্ধ করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখায় নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সংস্কৃতি এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা একটি পরিচ্ছন্ন শহরের পূর্বশর্ত।

সেলিম আহমেদের মতো সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারের এই উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা থাকলে আমাদের ঢাকা শহরকে বিশ্বের বুকে একটি মডেল শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা এমন একটা শহর চাই যেখানে নিরাপদে হাঁটা যাবে এবং যানজটমুক্ত পরিবেশে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই সাহসী পদক্ষেপ ঢাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। প্রশাসনের এই অনমনীয় অবস্থান অব্যাহত থাকলে রাজধানীর চেহারা আমূল বদলে যাবে। নিউমার্কেটের এই বর্তমান চিত্র যদি সারা শহরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে ঢাকা হবে যানজটমুক্ত এবং আধুনিক। পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দখলদারিত্বের সংস্কৃতি বন্ধ করাই এখন সময়ের দাবি। সরকারের এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হোক এবং স্বপ্নের তিলোত্তমা ঢাকা ফিরে আসুক তার নিজস্ব মহিমায় এটাই এখন নগরবাসীর প্রার্থনা।

এএন