সহপাঠীদের জড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে অঝোরে কাঁদলেন রামিসার বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
সহপাঠীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে মাত্র সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে কেটে খণ্ড-বিখণ্ড করে হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ ও শোকাচ্ছন্ন পুরো বাংলাদেশ। একদিকে দেশজুড়ে খুনিদের ফাঁসির দাবিতে রাজপথে উত্তাল বিক্ষোভ, অন্যদিকে ভুক্তভোগী পরিবারটির ঘরে চলছে চিরতরে সন্তান হারানোর মাতম। 

এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার রামিসার বিদ্যাপীঠে তৈরি হলো এক অবর্ণনীয় ও করুণ দৃশ্য, যা উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ পুরো দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে।

নিহত রামিসা রাজধানীর মিরপুরের ‘পপুলার মডেল স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আজ সকালে রামিসার শোকার্ত বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা মেয়ের স্মৃতিবিজড়িত সেই চেনা শ্রেণিকক্ষে পা রাখেন। যেখানে প্রতিদিন তার ফুটফুটে মেয়েটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাস করতে আসত, বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে বেঞ্চে বসত,সেখানে আজ শুধুই শূন্যতা। 

শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেই রামিসার সহপাঠীদের দেখে নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি হতভাগ্য এই পিতা। তিনি রামিসার বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কাঁদছে রামিসার সহপাঠীরা। 

বাবার এই বুকফাটা আর্তনাদ স্পর্শ করে দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদেরও। প্রিয় বান্ধবিকে হারানোর বেদনায় রামিসার সহপাঠীরাও ক্লাসের ভেতরেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে এক আবেগঘন ও থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। 

খুদে শিক্ষার্থীরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কারও চোখের পানি থামানো যাচ্ছিল না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রামিসার সহপাঠীরা বলে, রামিসাকে আমরা কখনোই ভুলতে পারব না। ও আমাদের অনেক ভালো বন্ধু ছিল। আমরা আমাদের বান্ধবিকে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। খুনি সোহেল রানার যেন ফাঁসি হয়, সে যেন কোনোভাবেই পার না পায়।

এদিকে, পল্লবীর এই পৈশাচিক ও জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ক্ষোভে ফুঁসছে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুততম সময়ে শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠনসহ সাধারণ পেশাজীবী মানুষ।

বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবী এলাকায় রামিসার বাসার সামনে জড়ো হন শত শত এলাকাবাসী এবং তার স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকেরা। তারা সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিতের জোর দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও লাইভে দেখা যায়, রামিসা হত্যার বিচার চেয়ে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সহপাঠীরা একপর্যায়ে পল্লবী থানার সামনে গিয়ে অবস্থান নেন এবং সেখানে তীব্র শ্লোগান দিতে থাকেন।

বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ও সহপাঠীরা পল্লবী থানার সীমানা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। তারা সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানান, এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেবল কারাগারে আটকে রাখলে চলবে না, বরং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত সময়ে তার ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে।

শিশু রামিসা হত্যার প্রতিবাদে এবং খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আজ রাজধানীতে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের মহিলা বিভাগ। দলটির নারী নেত্রীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সমাজে আজ শিশুদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। 

মাদ্রাসায় কিংবা বাসার ভেতরে কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। রামিসার মতো একটি অবুঝ শিশুকে যেভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও পরে কসাইয়ের মতো কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে, তা মানবতাকে লজ্জিত করে। তারা অবিলম্বে খুনিদের ফাঁসির কাষ্ঠে দাঁড় করানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

রাজধানীর বাইরেও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রামিসার গ্রামের বাড়ি শেরপুরে আজ বিকেলে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শেরপুরের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আজকের তারুণ্য’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই মানববন্ধনে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। 

শেরপুর থেকে বক্তারা বলেন, রামিসা শুধু আবদুল হান্নানের মেয়ে ছিল না, সে আজ পুরো বাংলাদেশের সন্তান। এই খুনিকে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে দেশের কোনো বাবাই তার কন্যাসন্তানকে নিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন না।

মঙ্গলবার সকালে মিরপুরের পল্লবীর একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করার পর এই নৃশংস ঘটনার কথা প্রথম প্রকাশ পায়। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে যায় একই ভবনের বাসিন্দা সোহেল রানা। সেখানে শিশুটির ওপর পাশবিক যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ চালানো হয়।

ধর্ষণের পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সোহেল রানা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় রামিসাকে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যা করে। এরপর অপরাধের আলামত ও লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে সে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির কোমল শরীরকে কয়েক টুকরো করে কেটে ফেলে। পুলিশ যখন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালায়, তখন খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে ভেতরের বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে। এই লোহমর্ষক ঘটনা পুরো পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয়দের স্তব্ধ করে দেয়।

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর নিহত রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার পর পরই অভিযান চালিয়ে প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পুলিশের সন্দেহ, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আলামত গোপন এবং লাশ গুমে স্বপ্না আক্তার তার স্বামীকে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন।

পরবর্তীতে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে পুলিশের কাছে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে। এরপর ২০ মে তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে, সে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়। 

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা অনুযায়ী আদালতের বিচারকের খাস কামরায় সোহেল রানা নিজের মুখে স্বীকার করেছে কীভাবে সে রামিসাকে ঘরে এনেছিল, কীভাবে ধর্ষণ করেছে এবং পরে লাশ কেটে খণ্ড-বিখণ্ড করে লুকিয়ে রেখেছিল। আদালত জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আগেই জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

ইতিমধ্যেই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আইনমন্ত্রী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার সুনির্দিষ্ট ও নিশ্ছিদ্র তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে রাষ্ট্রপক্ষ সব ধরনের আইনি সহযোগিতা প্রদান করবে।

তবে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অতীতেও অনেক শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় লঘু শাস্তির নজির রয়েছে। রামিসার ক্ষেত্রে যেন তেমনটা না হয়। রামিসার সহপাঠী ও শিক্ষকেরা আজ যে চোখের পানি ফেলেছেন, তার একমাত্র উপশম হতে পারে খুনি সোহেল রানার দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকর করা। পুরো দেশ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আদালত এই পৈশাচিকতার কী রায় দেয়, তা দেখার জন্য।

এএন