রাজধানীর পল্লবীর ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তার আর কখনো স্কুলে ফিরবে না। দ্বিতীয় শ্রেণির এই মেধাবী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় এবারও প্রথম হয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নিতে স্কুলে চকলেট ও মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার। সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলারও পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সেই আনন্দ আর পূরণ হয়নি। এর আগেই নির্মম নির্যাতন ও হত্যার শিকার হতে হয়েছে তাকে।
রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পড়াশোনায় সবসময় ভালো ফল করতো। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে সে ছিল শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী একটি শিশু। তবে সেই শিশুটির জীবনে এমন ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা কল্পনাও করতে পারেনি কেউ।
গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি ভবনের পাশের ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় তার খণ্ডিত মাথা। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে সোহেল রানা জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ছোট্ট রামিসা। এ সময় শিশুটির মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। তখন সোহেল তাকে গলাকেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে তার মাথা শরীর থেকে আলাদা করা হয়। দুই হাতও কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখা হয়।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিল সোহেল। একপর্যায়ে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না বলেও জানায় অভিযুক্ত।
এদিকে শোক আর ক্ষোভে ভারী হয়ে আছে পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ। সহপাঠীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এখনও কান্নার শব্দ শোনা যায় শ্রেণিকক্ষগুলোতে। শিক্ষকরা বলছেন, একটি প্রাণবন্ত ও মেধাবী শিশুকে এভাবে হারানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, রামিসা কখনো প্রথম, কখনো দ্বিতীয় হতো। তার অর্জিত পুরস্কারগুলো এখনও স্কুলে সংরক্ষিত আছে। খুবই মেধাবী ও ভদ্র একটি মেয়ে ছিল সে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
রামিসার সহপাঠীদের কণ্ঠেও ছিল গভীর শোক। এক সহপাঠী জানায়, ফল প্রকাশের দিন রামিসা খুব খুশি ছিল। সে বলেছিল, পরদিন চকলেট ও মিষ্টি নিয়ে আসবে, সবাই মিলে খাবে ও খেলবে। আরেক সহপাঠী বলে, রামিসা আমার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসতো। খুব ভালো ছিল। ও আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের একজন ছিল।
কাঁদতে কাঁদতে আরেক শিক্ষার্থী বলে, ও আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল। এখন আমার পাশে নেই। খুব মন খারাপ লাগে।
রামিসা বাবা-মা ও বড় বোনের সঙ্গে পল্লবীতে ভাড়া বাসায় থাকতো। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৯ মে সকালে একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ভবনের ভাড়াটিয়া সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর আসামি পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় তদন্তাধীন রয়েছে।
জেএইচআর