চৌগাছায় শীতে খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন গাছিরা

এম এ মান্নান, চৌগাছা (যশোর) প্রকাশিত: অক্টোবর ১২, ২০২৫, ০৭:০৩ পিএম

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় শীত মৌসুমে খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় গাছিরা। 

শীতের আগমন বার্তা ঋতুবৈচিত্রের মধ্যদিয়ে এখন রাতের শেষের কুয়াশা থেকে পাওয়া যাচ্ছে। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য খেজুর রস সংগ্রহে চৌগাছা উপজেলার মাঠে মাঠে গাছিরা গাছ প্রস্তুতের কাজে নিয়মিত সময় ব্যয় করছেন। এ ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত কয়েক বছর ধরে গাছি সমাবেশ, খেজুরের গুড়ের মেলা এবং খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অল্প সময়ের মধ্যে পূবালী বাতাসে চির সবুজের বুকচিরা অপরূপ সৌন্দর্য সকলের মন মাতিয়ে তুলবে মিষ্টি খেজুর রস ও গুড়ের ঘ্রাণে। কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে রস সংগ্রহ ও গাছ পরিচর্যার কাজ। চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রান্তিক গাছিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গ্রামের সকালের শিশিরের সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীত।

সরাসরি হাকিমপুর ইউনিয়নের যাত্রপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গাছিরা রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন।

এ সময় কথা হয় যাত্রাপুর গ্রামের গাছি আজিজুর রহমান বুদো, বাবু, নুর হোসেন নুরো, নাজিম উদ্দীন, নিজাম উদ্দীন, নাসির উদ্দীন ও গেসু মিয়া। 

তারা জানান, আগাম খেজুরের গুড় পেতে শীত মৌসুমের শুরুতেই গাছ প্রস্তুত শুরু করেছেন। এ বছর ১টি গাছ প্রস্তুত করতে মজুরি ধরা হয়েছে ১২০ টাকা, একজন দিনে ২০-২৫টি গাছ প্রস্তুত করতে পারেন।

আর মাত্র কয়েক দিন পর রস সংগ্রহ ও গুড় ও পাটালি প্রস্তুতি শুরু হবে এবং চলবে প্রায় ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। চৌগাছার খেজুর রস ও গুড়ের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও গাছির পেশা। এক দশক আগে বিভিন্ন অঞ্চলের পতিত জমি, ক্ষেতের আইলে, ঝোপঝাড় ও রাস্তার ধারে অসংখ্য খেজুর গাছ দেখা যেত।

শীতকালে শহর থেকে মানুষ দলে দলে গ্রামে আসে খেজুর রস-গুড় উপভোগ করতে। এক সময় সন্ধ্যাকালীন গ্রামীণ পরিবেশ খেজুর রসে মধুর হয়ে উঠতো। গাছিরা দিনভর রস জ্বালিয়ে পাতলা ঝোলা, দানা গুড় ও পাটালি তৈরির কাজে মেতে থাকতো। নতুন প্রজন্মের কাছে এখন তা রূপকথার মতো মনে হয়। শীত যত বেশি পড়বে, খেজুর গাছ তত বেশি মিষ্টি রস দেবে।

উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের পেটভরা গ্রামের গাছি শাহিনুর রহমান বলেন, পুরো শীত মৌসুমে চলে রস, গুড়, পিঠা, পুলি ও পায়েস খাওয়ার মহা উৎসব। শহর থেকে সকলে গ্রামের বাড়িতে আসে রস-গুড় খেতে। তবে নতুন করে কেউ খেজুর গাছ তোলা বা কাটার কাজ করতে চায় না। খেজুর গাছ আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও জীবনধারায় মিশে আছে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। একটি খেজুর গাছ ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত রস দেয়। এছাড়া খেজুরের পাতা জ্বালানি কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে জয়বায়ু পরিবর্তন, কালের বিবর্তন ও বন বিভাগের নজরদারীর অভাবে খেজুর গাছ উপজেলা জুড়ে বিলুপ্তির পথে।

চৌগাছা উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা চৌগাছা খেজুর গুড়কে জিআই পণ্যের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হুসাইন বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে। গাছিদের কাজ শিল্প ও দক্ষতায় ভরা। ডাল কেটে গাছের শুভ্র বুক বের করার মধ্যে কৌশল, ধৈর্য ও অপেক্ষার পালা রয়েছে। মৌসুমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ গাছিদের কদর বাড়ে। আমরা তাদের প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক ও সমাবেশের মাধ্যমে সহায়তা করেছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসমিন জাহান (অ. দা.) বলেন, যশোরের খেজুর রস ঐতিহ্য রক্ষার্থে উপজেলার বিভিন্ন সড়কের ধারে খেজুর গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এ পেশার সঙ্গে যুক্ত গাছিদের সমাবেশে উৎসাহ প্রদান ও সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ইএইচ