শিক্ষককে টাকা না দেয়ায় বোর্ড পরীক্ষা দিতে পারেনি শিক্ষার্থী সোহান

ওমর ফারুক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৫, ০৪:৫৪ পিএম

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের মরিচবুনিয়া গ্রামের হতদরিদ্র পিতা আনোয়ার হাওলাদারের ছেলে সোহান। 

গত দুই মাস ধরে ভোকেশনাল (৯ম শ্রেণি) বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় পরীক্ষার উদ্দেশ্যে অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে উপজেলার সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হন সোহান।

পরীক্ষা কেন্দ্রে এসে জানতে পারেন, টাকা নেওয়া সত্ত্বেও প্রবেশপত্রসহ প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্র শিক্ষক সম্পাদন করেননি। ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও পরীক্ষা দিতে না পারায় কাঁদতে শুরু করেন সোহান। শিক্ষক হাসানের চাহিদামত ১০ হাজার টাকা পরিশোধ না করায় তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়াই ভেজা চোখে বাড়ি ফিরে যান। এমন অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী সোহানের পরিবারের সদস্যরা।

পরিবারের বরাত দিয়ে বলা হয়, সোহানের জীবন থেকে একটি বছর যেন ঝরে গেছে। দরিদ্র পিতা আবার তাকে লেখাপড়ার সুযোগ দেবেন কিনা, সেটিও প্রশ্নের মুখে রয়েছে।

সোহান অভিযোগ করেন তিন মাস আগে তিনি পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি হয়ে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে ৩,৫০০ টাকা প্রদান করেছেন শিক্ষক হাসানের হাতে। নিয়মানুযায়ী ৬ নভেম্বর সকালে অন্যান্য সহপাঠীদের সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হন। তবে পুলিশি পাহারায় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রবেশপত্র জমা দিতে পারেননি। ফোনে স্বল্প সময়ের মধ্যে অনুমতি পত্র আনতে বললেও পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে মোবাইল বন্ধ রাখেন শিক্ষক হাসান।

পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে, মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থী সোহান। উপস্থিত অভিভাবক ও পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও তাকে শান্তনা দিতে পারেননি।

সোহানের চাচা মো. ওমর ফারুক জানান, রেজিস্ট্রেশন ফিসহ ৩,৫০০ টাকা দেওয়ার পরও অতিরিক্ত ১০,০০০ টাকা চেয়েছিলেন শিক্ষক হাসান। এই কারণে ভাতিজা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।

জানা যায়, শিক্ষক হাসান ধানখালী পাচজুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন ১৭ বছর ধরে। তিনি রেজুলেশন বই, শিক্ষার্থীদের আইডি ও পাসওয়ার্ড পর্যন্ত নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উপজেলা কর্মকর্তারাও এ তথ্য শুনে অবাক হয়েছেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুতুবউদ্দিন বলেন, “আমি এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেছি প্রায় এক বছর। আমার আগের চারজন প্রধান শিক্ষক ভোকেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। হাসানের একক আধিপত্যের কারণে কেউ মুখ খুলতে পারত না। আমি জানতে চাওয়ায় দুদিন আগে হুমকি দিয়েছেন। ইউএনও ও অন্যান্য কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে রেজুলেশন বই চাইলেও ফেরত দেননি।”

হাসানের বোন ও সহকারী শিক্ষক ইমরানা বেগম বলেন, ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষিকা তুলশি রানী ভোকেশনাল কার্যক্রমের কাগজপত্র হাসানের মাধ্যমে সম্পাদন করেছিলেন। এরপর ১৭ বছর ধরে রেজুলেশন বইসহ কোনো কিছু ফেরত দেননি। তিনি স্বীকার করেছেন, প্রভাব খাটিয়ে এবং অনৈতিকভাবে তার ভাই অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান বলেন, “একটি পরীক্ষা গেছে, এতে সমস্যা নেই, আগামী বছর দেবে। প্রতিষ্ঠান আমার টাকায় হয়েছে, তাই আমি মানুষ দিয়ে চালাই। শিক্ষার্থীর কাছে টাকা দাবির বিষয়টি বোর্ডে দিতে হবে।”

কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মনির হোসেন জানান, “পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলাম, বিষয়টি জানতে পেরেছি। ইউএনওও আগেই বিষয়টি জানতেন। শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি উপরস্থ কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ইএইচ