কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে সোমবার রাতে এক প্রলয়ংকরী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
রাত ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই আগুন মুহূর্তের মধ্যেই ইয়ার্ডের বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে বাতাসের তীব্রতা ও দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, মাতারবাড়ী টাউনশিপ সংলগ্ন খোলা জায়গায় তৈরি করা স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে প্রথম আগুনের শিখা দেখা যায়। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ কাঠ, টিন, লোহার রড এবং পরিত্যক্ত দাহ্য পদার্থ স্তূপ করে রাখা ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী লবণশ্রমিক আমজাদ হোসেন জানান, রাত সোয়া ৯টার দিকে হঠাৎ ইয়ার্ডের দিক থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। দ্রুত খবর দেওয়া হলে মহেশখালী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু আগুনের ভয়াবহতা বেশি হওয়ায় পরে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস থেকেও আরও দুটি ইউনিটকে তলব করা হয়।
মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল ইউনিট বা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে এই স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডটির দূরত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার। ফলে মূল বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটে সরাসরি আগুনের আঁচ লাগার সম্ভাবনা কম থাকলেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং আগুনের ফুলকি পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যেন আগুন কোনোভাবেই টাউনশিপ বা মূল কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে না পারে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে প্রাথমিক একটি ধারণা পাওয়া গেছে। মাতারবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিটের টিম লিডার সালাহ উদ্দিন জানান, স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডটি একটি খোলা জায়গায় হওয়ায় প্রায়ই রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা মালামাল চুরি করতে সেখানে প্রবেশ করে।
তার ধারণা, চোর চক্রের ফেলে দেওয়া সিগারেট বা অন্য কোনো অগ্নিশিখা থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে নাশকতার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে আগুনের সঠিক কারণ নিশ্চিত করা যাবে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে মহেশখালী ও চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের মোট চারটি ইউনিটের বিশজনেরও বেশি কর্মী কাজ করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পানি সরবরাহ ও অন্যান্য কাজে সহায়তা করছেন।
তবে ইয়ার্ডে থাকা কাঠের স্তূপ আগুনের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, পানি ছিটানোর পাশাপাশি আগুন যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির চেষ্টা চলছে।
স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে রাখা মালামালের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মূল্যবান লোহা ও টিন আগুনের তাপে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে এখনো ক্ষয়ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। রাত ১২টা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। এখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা জোরদার করাই এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ইএইচ