সাভারে পরিত্যক্ত ভবন যেন ‘মৃত্যুকূপ’, তিন মাসে উদ্ধার ৫ মরদেহ

আলী রেজা রাজু, সাভার (ঢাকা) প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

সাভার থানা থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে, সেনা ক্যাম্পের মুখোমুখি এবং প্রেসক্লাবের একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবন। এ তিন প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে থাকা ভবনটি গত তিন মাসে এক ভয়ংকর হত্যার ডাম্পিং জোনে পরিণত হয়েছে। 

রোববার আবারও এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে দুটি বিকৃত মরদেহ। সব মিলিয়ে গত তিন মাসে এ ভবন থেকেই পাওয়া গেল ৫টি নৃশংসভাবে হত্যাকৃত লাশ। তবুও নেই কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা এলাকাবাসীর ক্ষোভকে চরম হতাশায় রূপ দিয়েছে।

দুপুরে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত পরিচয়ের দুটি বিকৃত মরদেহ। লাশ দুটি এমনভাবে নষ্ট করা হয়েছে যে প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, অপরাধীরা নিশ্চিতভাবেই জানে এ ভবনে লাশ ফেললেও দীর্ঘদিন কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। এর আগে গত ২৯ আগস্ট ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় হাত পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের পচাগলা মরদেহ। চার মাস পেরিয়ে গেলেও আজও তার পরিচয় শনাক্ত হয়নি এবং রহস্য উদঘাটন হয়নি।

এরপর ১২ অক্টোবর একই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে উদ্ধার হয় এক নারীর জবাই করা অর্ধনগ্ন মরদেহ। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত চললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। 

গত ২০ ডিসেম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে উদ্ধার হয় আগুনে পোড়া ও অর্ধগলিত এক যুবকের মরদেহ। 

পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে প্রমাণ নষ্টের উদ্দেশ্যে আগুন ধরানো হয়। আর আজ পুনরায় উদ্ধার হলো আরও দুটি বিকৃত লাশ। এ নিয়ে মোট ৫টি মরদেহ পাওয়া গেল।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই ভবনটি মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মালিকানা জটিলতার অজুহাতে ভবনটি পরিত্যক্ত থাকলেও নিরাপত্তা, সিসিটিভি বা পাহারার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। 

সাভার কলেজের ঠিক সামনে এমন একটি মৃত্যুকূপ থাকায় সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। দিনের আলোতেও ভবনটির পাশ দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগে বলে জানায় তারা। একের পর এক খুনের ঘটনায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের কলেজে পাঠানো নিয়েই দ্বিধায় পড়েছেন।

ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, মরদেহগুলো বিকৃত ও অর্ধগলিত হওয়ায় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। শনাক্ত হলে আসামি গ্রেপ্তার সহজ হবে। 

ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কোথাও হত্যার পর লাশ এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, অন্য কোথাও খুন হলে বারবার এ ভবনটিকেই কেন বেছে নেওয়া হচ্ছে? থানা ও সেনা ক্যাম্পের এত কাছে থেকেও কীভাবে এটি খুনিদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠল?

পৌরসভার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে জানতে পৌর প্রশাসকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

থানা, সেনা ক্যাম্প ও প্রেসক্লাবের এত কাছে থেকেও একটি ভবন বারবার হত্যার ডাম্পিং জোনে পরিণত হওয়া আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন প্রমাণ বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

এলাকাবাসীর আশঙ্কা, অবিলম্বে ভবনটি সিলগালা, স্থায়ী নিরাপত্তা ও আলোকসজ্জা নিশ্চিত না করা হলে সামনে আরও লাশ পড়বে। 

এ বিষয়ে সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আরমান আলী বলেন, আমরা দ্রুত রহস্য উদঘাটনে কাজ করছি।

ইএইচ