লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনের নির্বাচনী লড়াইকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
রোববার বিকেলে হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় বিজিবি ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার শুরু হয় আজ রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে। লালমনিরহাট-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে একদল নারী কর্মী টংভাঙ্গা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। প্রচারণার এক পর্যায়ে তারা ওই এলাকার বিএনপি প্রার্থী হাসান রাজিব প্রধানের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়িতে প্রবেশ করেন। সেখানে বিএনপি কর্মীরা নারী কর্মীদের নির্বাচনী লিফলেট বিলিতে বাধা প্রদান করেন।
বিএনপির সমর্থকদের দাবি ছিল, সংশ্লিষ্ট এলাকাটি তাদের শক্ত ঘাঁটি এবং সেখানে অন্য কোনো দলের প্রচারণার প্রয়োজন নেই। এই বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। খবর পেয়ে উভয় পক্ষের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকেন। মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষ শুরু হলে টংভাঙ্গা গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুই পক্ষের সমর্থকরা একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। সংঘর্ষ চলাকালীন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এ সময় রাস্তার পাশে থাকা অন্তত ৫টি থেকে ৬টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। ইতোমধ্যে সংঘর্ষের ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ছোট একটি বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক কীভাবে চরম সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ভিডিওতে উভয় পক্ষের সমর্থকদের একে অপরকে ধাওয়া করতে এবং লাঠিপেটা করতে দেখা যায়।
স্থানীয়রা বলছেন, দুই দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সুসম্পর্ক থাকলেও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগে থেকেই এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ছিল, যা আজ প্রকাশ্যে এলো।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও তাদের হাতীবান্ধা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের কয়েকজনের মাথায় আঘাত রয়েছে, তবে বর্তমানে তারা আশঙ্কামুক্ত। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় হাতীবান্ধা থানা পুলিশ। পরবর্তীতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা এইচ এম রকিব হায়দার এবং পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বিজিবি ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। আইন ভঙ্গকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বিএনপির প্রার্থী হাসান রাজিব প্রধান বর্তমানে পাটগ্রাম এলাকায় নির্বাচনী উঠান বৈঠকে ব্যস্ত রয়েছেন। তিনি মুঠোফোনে জানান, টংভাঙ্গার ঘটনার কথা আমি শুনেছি। তবে আমি ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকায় ঠিক কী কারণে এবং কীভাবে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে তা বিস্তারিত জানতে পারিনি। আমি আমার নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছি।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করার একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, তাদের শান্তিপূর্ণ নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও বাধা প্রদান করার মাধ্যমেই এই সংঘাত উসকে দেওয়া হয়েছে।
হাতীবান্ধা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি শাহীন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আহত হওয়ার বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির সমর্থকদের এমন মারমুখী অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, এই ঘটনার রেশ ধরে আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী এলাকায় আরও বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ভোটারদের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে কোনো আপস করা হবে না।