একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জনপদে তেলের সংকটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক মর্মান্তিক মৃত্যু এবং তার পরবর্তী ছাত্র-শ্রমিক উত্তেজনায় কাঁপছে ঝিনাইদহ। ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় তেল নিতে গিয়ে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের পিটুনিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো শহর।
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মাঝে তুচ্ছ বাগবিতণ্ডা থেকে শুরু হওয়া একটি মারপিটের ঘটনা শেষ পর্যন্ত এক ছাত্রনেতার মৃত্যু এবং পরবর্তী এক বিশাল অরাজকতায় রূপ নিয়েছে ঝিনাইদহে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নীরব আহমেদ (২২) নিহত হওয়ার প্রতিবাদে গত রাতে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং আজ রোববার সকালে বাস শ্রমিকদের অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়ক।
সারা দেশের মতো ঝিনাইদহেও তেলের জন্য হাহাকার চরমে পৌঁছেছে। গত কাল শনিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত ‘তাজ ফিলিং স্টেশনে’ তেল নিতে যান নীরব আহমেদ। নীরব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ জেলা কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তেল দেওয়া নিয়ে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের সাথে নীরবের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তেলের রেশনিং ব্যবস্থা ও দীর্ঘ লাইনের কারণে এমনিতেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিতণ্ডার এক পর্যায়ে পাম্পের কর্মচারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে নীরবের ওপর হামলা চালায় এবং তাকে বেধড়ক পিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নীরব আহমেদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। উত্তেজিত জনতা তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিকের মালিকানাধীন আরাপপুর এলাকার ‘সৃজনী ফিলিং স্টেশনে’ হামলা চালায়। সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পর অগ্নিসংযোগ করা হয়।
বিক্ষোভের আগুন কেবল পাম্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পার্ক করে রাখা জেআর পরিবহনসহ মোট তিনটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় রাতের আকাশ রক্তিম হয়ে ওঠে এবং পুরো টার্মিনাল এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, এই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছাত্রনেতা নিহত হওয়ার সরাসরি প্রতিক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ।
রাতে বাসে আগুন দেওয়ার প্রতিবাদে আজ রোববার সকাল থেকে ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ বাস শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের দাবি, নিরপরাধ মালিকদের বাস কেন পুড়িয়ে দেওয়া হলো? তারা পুড়ে যাওয়া বাসগুলো সড়কের মাঝখানে আড়াআড়ি করে রেখে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর ফলে ঢাকা-ফরিদপুরগামী এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি রোকনুজ্জামান রানু বলেন, ‘টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে কারা আগুন দিল? আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? যারা এই কাজ করেছে তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা গাড়ি চালাব না।’
বেলা ১১টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাস মালিক ও শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসেন। তিনি আশ্বাস দেন যে, ছাত্রনেতা নিহতের ঘটনায় যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তেমনি বাসে আগুনের ঘটনাতেও জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশের এই জোরালো আশ্বাসের পর প্রায় ৩ ঘণ্টা পর শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন।
ইতিমধ্যেই তাজ ফিলিং স্টেশনের ৩ কর্মচারীকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পাম্প মালিক হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তার পাম্প ও বাস ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিহত নীরবের পরিবারে এখন মাতম চলছে। নীরবের সৎ বাবা হারুন অর রশীদ জানান, নীরব ঝিনাইদহ শহরে থেকে পড়াশোনা করত এবং আন্দোলনের সময় থেকেই সে সক্রিয় ছিল। একটি সামান্য তেলের পাম্পের কর্মচারীদের হাতে এভাবে মেধাবী এক যুবকের মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না। ময়নাতদন্ত শেষে আজই তাকে ঝিনাইদহ সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হবে।
ঝিনাইদহের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় সমস্যাগুলো কীভাবে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক অস্থিরতা ও চরম সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। তেলের অভাব যখন মানুষের ধৈর্য চ্যুতি ঘটাচ্ছে, তখন প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাব এবং পাম্প কর্মচারীদের উগ্র আচরণ একটি অমূল্য প্রাণের অবসান ঘটাল। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ এখন বিচার এবং নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চায়।
এএন