ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা একটি প্রাচীন কৃষিনির্ভর জনপদ, যার ইতিহাস, নদী ও কৃষি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মহেশপুরের আদি নাম ছিল ‘যোগী দাহা’। ১৭০১ সালে হিন্দু দেবতা মহেশ্বরের নামে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ‘মহেশপুর’। আবার অনেকের মতে, মহিষ্য রাজা মহেশ চন্দ্রের নামানুসারেও এই নামের উৎপত্তি।
কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি একসময় নদীবিধৌত উর্বর জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। কপোতাক্ষ ছাড়াও বেগবতী, চিত্রা, কুমার ও গড়াই নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা পলিমাটি সমৃদ্ধ জমিতে ধান, পাট, গম, আখ, পান-সুপারিসহ নানা ধরনের ফসলের ব্যাপক উৎপাদন হতো। কৃষিকেই কেন্দ্র করে এখানকার অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছে।
বর্তমানে কৃষি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও তথ্যনির্ভর করতে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। কৃষি বাতায়নের মাধ্যমে জেলার ১৫৯টি দাগ গুচ্ছ থেকে কৃষি জমির বাস্তব ব্যবহার, উৎপাদন, স্থায়ী ও অস্থায়ী ফসলের হিসাব, এমনকি কৃষি মজুরির তথ্য পর্যন্ত ডিজিটাল ফর্মে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যা কৃষি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এমন প্রেক্ষাপটে মহেশপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দত্তনগর কৃষি ফার্মে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি আবারও জোরালোভাবে উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে। প্রায় ২,৭৩৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দত্তনগর ফার্মটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি খামার হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রতিবছর প্রায় ৫,০০০ মেট্রিক টন ভিত্তিবীজ উৎপাদন হয়, যা দেশ-বিদেশে সরবরাহ করা হয়। আউশ, পাট, গম, মুগ, নেরিকা, কলাই, ভুট্টা, হাইব্রিড ধান ও আলুসহ নানা ফসলের বীজ উৎপাদনের এই কেন্দ্রটি গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার জন্য অত্যন্ত উপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪০ সালে কোলকাতার ঠিকাদার হেমেন্দ্র নাথ দত্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর খাদ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে এই খামার প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এখান থেকে হেলিকপ্টারযোগে সবজি পরিবহনের মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগও নেওয়া হয়, যা খামারটিকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার খামারটি অধিগ্রহণ করে এবং ১৯৬২ সালে এটি কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দত্তনগরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পূর্বেও সুপারিশ করেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হলে ইউজিসির একটি উচ্চপর্যায়ের তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন ইউজিসি সদস্য ড. আতফুল হাই শিবলী, পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা) ড. লুৎফে আলম এবং উপ-সচিব ফেরদৌস জামান। ২০১০ সালে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দিলেও রহস্যজনক কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১২ সালে এলাকাবাসী মিছিল ও মানববন্ধনের মাধ্যমে তাদের দাবির পক্ষে সোচ্চার হন। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখায় নতুন করে ক্ষোভ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দত্তনগরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। পাশাপাশি আধুনিক কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এএন