বন্দর মানেই একটি দেশের অর্থনীতির স্পন্দন। আর সেই স্পন্দন থেমে গেলে থেমে যায় বাণিজ্য, স্থবির হয়ে পড়ে উন্নয়ন। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর এক সময় এমনই এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার বেড়াজালে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু সেই অচলাবস্থার অন্ধকার ভেঙে আজ বন্দর দাঁড়িয়ে আছে নতুন গতি ও শক্তিতে। এই নাটকীয় রূপান্তরের পেছনে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি হলেন এস এম মনিরুজ্জামান, যাকে অনেকেই এখন বন্দরের ইতিহাসে একমাত্র “বীর পুরুষ” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের আগে বন্দর ছিল অনিয়ম ও দুর্নীতির এক বিশাল ক্ষেত্র। আর আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বন্দর ছিল খুবই বিশৃঙ্খল। বন্দর পরিচালনায় কাউকে খুঁজে পাওয়া বা দায়িত্ব নেওয়ার মতো কাউকে না পাওয়ার মুহূর্তে বুক চিতিয়ে সাহস করে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এস এম মনিরুজ্জামান। তিনি এই দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে দায়িত্ব নিতে পর্যন্ত অনেকে ভয় পেতেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মনিরুজ্জামান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে তিনি বন্দরের ভেঙে পড়া কাঠামো পুনর্গঠন শুরু করেন।
তার নেতৃত্বে কন্টেইনার জট নিরসন, পণ্য খালাসে গতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সব ক্ষেত্রেই আসে দৃশ্যমান পরিবর্তন। বন্দরের প্রতিটি কার্যক্রমে যুক্ত হয় গতিশীলতা, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন বিশ্বাসযোগ্যতা।
শুধু প্রশাসনিক সংস্কারেই থেমে থাকেননি তিনি। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির নানা অপচেষ্টা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপ, সবকিছুই তিনি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। কঠোর অবস্থান নিয়ে দমন করেছেন চুরি, কন্টেইনার পাচারসহ নানা অনিয়ম।
বন্দরকে ব্যবসাবান্ধব ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে তিনি নিয়েছেন একাধিক যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে কার্যক্রমে এনেছেন “বিদ্যুৎগতির” গতি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছেন দায়িত্ববোধ ও সাহস। ফলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বন্দর আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।
মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বের আরেকটি দিক হলো তার কর্মনিষ্ঠা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করে তিনি বন্দরের প্রতিটি কার্যক্রম তদারকি করেন। কোনো অনিয়ম বা আপসের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একেবারেই অনড়। ফলে নানা ফাঁদ ও দুর্নীতির চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে তার দৃঢ় অবস্থানের সামনে।
সরকারি মহল থেকেও তার এই ভূমিকার স্বীকৃতি এসেছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বন্দরের কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল পালিত হয় বন্দর দিবস। এ বছর বন্দর দিবসের ১৪৯তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও ব্যয় সংকোচনের কারণে এবার সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে, তবুও বন্দরের এই রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে দিবসটির গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আজকের চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি স্থাপনা নয় এটি দেশের অর্থনীতির গতির প্রতীক। আর সেই গতির পেছনে নেতৃত্বদানকারী মনিরুজ্জামান হয়ে উঠেছেন এক অনন্য নাম, এক সাহসী অধ্যায় যার গল্প এখন বন্দরের ইতিহাসে অনিবার্যভাবেই লেখা থাকবে।
এএন