গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা।
উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, ডিজেল তেলের মূল্য বৃদ্ধি, ঘন ঘন লোডশেডিং, সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানির সংকট, বিভিন্ন এলাকায় ধানে পোকা আক্রমণ এবং আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারণে এ বছর ধানের ফলন আশানুরূপ হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার ঢালজোড়া, মৌচাক, সফিপুর, সূত্রাপুর, বড়ইবাড়ী ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মাঠ থেকে ধান ঘরে তুললেও অধিকাংশ কৃষকের মুখে নেই স্বস্তির হাসি।
অনেকেই বলছেন, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে; লাভ তো দূরের কথা, বরং লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
ঢালজোড়া এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “এবার ধান চাষ করতে গিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ডিজেলের দাম অনেক বেশি, আবার বিদ্যুৎ ঠিকমতো পাইনি। নলকূপে পানি না থাকায় সময়মতো সেচ দিতে পারিনি। তার ওপর ধানে পোকা ধরেছে, ফলে ধানের শীষ ঠিকভাবে ভরেনি।”
মৌচাক এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, ধানের ফলন আগের বছরের তুলনায় অনেক কম হয়েছে, কিন্তু খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশক ও ডিজেলের দাম সবই বেশি। পোকা দমনে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে, তবুও পুরোপুরি রক্ষা করা যায়নি। এখন ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
সফিপুর এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছি। কিন্তু ফলন কম হওয়ায় এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। পোকা আক্রমণের কারণে অনেক জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। সরকার যদি আমাদের জন্য কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে আগামী মৌসুমে চাষ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্রাপুর এলাকার কৃষক রহিম উদ্দিন জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ পাম্প ঠিকমতো চালানো যায়নি। আবার ধানে পোকা ধরায় ফলন আরও কমে গেছে। অনেক সময় রাতে বিদ্যুৎ আসে, তখন পানি দিতে হয়। এতে খরচও বাড়ে, আবার ঠিকভাবে কাজও করা যায় না।
এদিকে কৃষকদের পক্ষ থেকে নতুন করে দাবি তোলা হয়েছে—ধানের ন্যায্য মূল্য বৃদ্ধি না করা হলে ভবিষ্যতে অনেক কৃষক ধান চাষ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।
ঢালজোড়া এলাকার কৃষক আব্দুল করিম আরও বলেন, আমরা যদি ধানের সঠিক দাম না পাই, তাহলে আগামীতে ধান চাষ করা সম্ভব হবে না। অনেকেই ইতিমধ্যে অন্য ফসল বা পেশার কথা ভাবছেন।” একই সুরে মৌচাকের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, “এই অবস্থায় ধান চাষ করে টিকে থাকা কঠিন। সরকার যদি ধানের দাম না বাড়ায়, তাহলে অনেক কৃষকই ধান চাষ বাদ দিতে বাধ্য হবেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সেচ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব, গভীর নলকূপে পানির স্বল্পতা, সময়মতো পোকা দমনে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক জমিতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে এবং পোকা আক্রমণের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে মৌসুমের শুরুতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সময়মতো সেচ এবং সমন্বিত পোকা দমন ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো সম্ভব। তবে মাঠপর্যায়ে এসব সুবিধা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ হাসান বলেন, এ বছর আবহাওয়া, পোকা আক্রমণ এবং কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ধানের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। তবে কৃষকদের পাশে থাকতে আমরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। প্রণোদনা কার্যক্রম চালু রয়েছে। পোকা দমনে কৃষকদের সচেতন করতে কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, কৃষকদের এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পোকা দমন কার্যক্রম জোরদার, কৃষি উপকরণের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষকদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এম জি