নেত্রকোনায় মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক রিমান্ডে

গোলাম কিবরিয়া সোহেল, নেত্রকোণা প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পৈশাচিক ঘটনায় অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। 

বৃহস্পতিবার দুপুরে নেত্রকোনার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহসিনা ইসলাম এই আদেশ প্রদান করেন।

আদালত সূত্র জানায়, বেলা ১১টার দিকে কড়া পুলিশি পাহারায় আসামিকে বিচারকের খাস কামরায় হাজির করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে এবং নেপথ্যের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।

নেত্রকোনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি (পিপি) নূরুল কবির আদালতের কার্যক্রম শেষে গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি চরম সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তিনি বলেন, আমরা আদালতে জোর দাবি জানিয়েছি যেন ভিকটিমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। ইতিমধ্যে শিশুটি আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে আসামির অপরাধের বিবরণ দিয়েছে। ভবিষ্যতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃপরিচয় ও অপরাধ নিশ্চিত করার বিষয়েও আদালত ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তবে আইনজীবী নূরুল কবির একটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এনেছেন। তিনি জানান, মামলাটি ভিন্ন খাতে নিতে এবং অপরাধীকে আড়াল করতে একটি গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমনকি যে নারী চিকিৎসক সাহস করে শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা শেষে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার রিপোর্ট দিয়েছিলেন, তাকেও বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আদালত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, অভিযুক্ত শিক্ষক চার বছর আগে স্থানীয় এলাকায় একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিশুটি তার নানার বাড়িতে থেকে ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। পারিবারিক টানাপোড়েনের শিকার শিশুটির বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় মা জীবিকার সন্ধানে সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। অভিভাবকের এই অনুপস্থিতি ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে লম্পট শিক্ষক শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং তার শারীরিক পরিবর্তন নানির নজরে এলে বিষয়টি জানাজানি হয়। সিলেট থেকে তার মা ফিরে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং শিক্ষকের কুকীর্তির কথা প্রকাশ করে। মদন উপজেলা শহরের একটি ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, ১১ বছরের এই শিশুটি এখন কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে মদন থানায় মামলা দায়ের করার পর থেকেই পলাতক ছিলেন ওই শিক্ষক। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। কখনও আত্মীয়ের বাসা, কখনও বা প্রত্যন্ত এলাকায় লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সোনামপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে র‍্যাব-১৪-এর একটি বিশেষ দল তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রিমান্ডের এই তিন দিনে আসামির কাছ থেকে ঘটনার সময়কাল এবং সে আর কোনো শিশুর ওপর এমন আচরণ করেছে কি না, তা বের করার চেষ্টা করা হবে।

এই মামলার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো ভিকটিমের চিকিৎসা করা নারী চিকিৎসকের নিরাপত্তা। সাহসী এই চিকিৎসক যখন শিশুটির অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তখন থেকেই তাকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি প্রভাবশালী মহল পেশাদার এই চিকিৎসকের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে যাতে তিনি তার মেডিকেল রিপোর্ট পরিবর্তন বা মামলা থেকে সরে দাঁড়ান।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসককে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কোনো পেশাদার ব্যক্তিকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া বা ভয় দেখানো বরদাশত করা হবে না। চিকিৎসকের নিরাপত্তার জন্য আমরা বিশেষ নজরদারি রাখছি এবং যারা এসব হুমকির পেছনে রয়েছে, তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে।

১১ বছরের একটি শিশুর এই করুণ পরিস্থিতি নেত্রকোনা জেলাজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিশ্বাসের জায়গায় আঘাতকারী এই শিক্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা মনে করছেন, এই ঘটনায় শিশুটির মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের ওপর মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন নির্যাতনের ঘটনা রুখতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে অভিভাবকহীন বা বাবা-মায়ের দূরত্বের সুযোগ নিয়ে যারা শিশুদের শিকার বানায়, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

রিমান্ডের আদেশে আজ এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও মানুষের মনে বড় প্রশ্ন, এই মামলাটি কি প্রভাবমুক্তভাবে শেষ হবে? কারণ ইতিমধ্যে চিকিৎসককে হুমকি ও সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার সচেতন মহল মনে করছে, প্রশাসনের শক্ত অবস্থান এবং আদালতের ন্যায়নিষ্ঠাই পারে এই পৈশাচিক ঘটনার শিকার শিশুটিকে ন্যায়বিচার এনে দিতে।

আগামী তিন দিনের জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ আরও নতুন তথ্য পায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। শিশুটি এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার শৈশব কেড়ে নিয়েছে এক নরপিশাচ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন তার এবং অনাগত সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।

এএন