অডিও ফাঁস 

চোরাই মাল জব্দের পর এসআইয়ের ঘুষের ‘দর কষাকষি’

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাকে থেকেও অপরাধীর সঙ্গে দর কষাকষি এবং মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দের পর তা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত এসআইয়ের ঘুষ চাওয়ার একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত এসআই মো. আবু হানিফাকে থানা থেকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও পুলিশি পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। জেলা পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এবং স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে লাইন ক্লোজ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার গভীর রাতে। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে একটি পিকআপ ভ্যান থেকে ১৮ বস্তা অবৈধ ভারতীয় প্রসাধনী উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে দামী বডি স্প্রে, শ্যাম্পু ও অলিভ অয়েল ছিল। ঘটনাস্থল থেকে পিকআপ চালক নাছিম (২৩) ও তার সহকারী মনির হোসেনকে (২১) আটক করে পুলিশ।

পরবর্তীতে এই ঘটনায় রাজনগর গ্রামের জসিম উদ্দিনকে প্রধান অভিযুক্ত করে মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি চোরাচালান মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি রেকর্ডে জসিমকে চোরাই পণ্যের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পর্দার আড়ালে চলছিল ভিন্ন খেলা।

ফেসবুক ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ড এবং ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ডের দুটি অডিও ক্লিপে এসআই আবু হানিফা এবং মামলার মূল আসামি জসিম উদ্দিনের মধ্যে সরাসরি ঘুষ নিয়ে দর কষাকষি শোনা যায়।

প্রথম অডিওতে শোনা যায়, জসিম উদ্দিন এসআই হানিফাকে অনুরোধ করছেন যেন বড় মামলা না দিয়ে বিষয়টি হালকা করা হয়। জসিম বলেন, স্যার, আপনাকে ৮০ হাজার টাকা দিচ্ছি, আমাকে মামলা দিয়েন না। শুধু দুই বস্তা মাল আটক দেখান (বাকিটা ছেড়ে দেন)।

উত্তরে এসআই হানিফাকে বলতে শোনা যায়, ‘না ভাই, যা বলছি তার কম হবে না। আপনি তিন লাখ টাকা দেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে এসআই আরও বলেন, “ওসি স্যার কিন্তু বিপক্ষে যাবে না। ওসি স্যার বলছেন, যেহেতু আমাকে জানিয়ে আপনারা করেছেন, দারোগার সঙ্গে কথা বলেন।

রাত ১টা ৪১ মিনিটে রেকর্ড করা দ্বিতীয় অডিওতে এসআইয়ের কণ্ঠে তাড়া দেওয়ার সুর শোনা যায়। তিনি জসিমকে বলেন, “যা করবেন তাড়াতাড়ি করেন। আমি ভবানীপুর ব্রিজ পার হচ্ছি। আপনার জন্য ছাড় দিলাম, আড়াই লাখ টাকা নিয়ে আসেন।‘জসিম তখন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সময় চান। অডিওর শেষে এসআই সতর্ক করে বলেন, “হোয়াটসঅ্যাপের কথা অন্য ফোনে রেকর্ড করা যায়, এটা করবেন না কিন্তু।

অডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নড়েচড়ে বসে জেলা পুলিশ প্রশাসন। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম অভিযুক্ত এসআই মো. আবু হানিফাকে কলমাকান্দা থানা থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করার আদেশ দেন।

একই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এসপি তারিকুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে অডিওতে ওসির নাম আসায় এলাকায় নানা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। তবে কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেন নিজের সংশ্লিষ্টতা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখছেন। আমি এই ধরনের কোনো অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নই। পলাতক আসামি জসিমকে ধরার চেষ্টা চলছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একজন এসআই সাহস করে ওসির নাম ব্যবহার করে তিন লাখ টাকা দাবি করার অর্থ হলো এই চক্রটি দীর্ঘদিনের। চোরাচালান দমনের নামে অনেক সময় পণ্য জব্দ করে তার বড় একটি অংশ আত্মসাৎ করা বা আসামিকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। এই অডিও ফাঁসের ঘটনাটি কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র।

জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া যাদের কাজ, তাদেরই একজন যদি অপরাধীর সঙ্গে ‘ভাগাভাগি’র চুক্তিতে লিপ্ত হন, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। নেত্রকোনার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই তদন্ত যেন কেবল ‘আইওয়াশ’ না হয়। যদি এসআই অপরাধী হন, তবে তাকে কেবল থানা থেকে প্রত্যাহার নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

অভিযুক্ত এসআই আবু হানিফা এবং মামলার আসামি জসিম উদ্দিনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাদের সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে অডিওটির ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং কল রেকর্ড যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে।

সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলায় চোরাচালান একটি নিত্যদিনের সমস্যা। কিন্তু পুলিশের ভেতরের এই অসাধুতা চোরাকারবারিদের আরও উৎসাহিত করছে কিনা, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর জানা যাবে, এই ঘুষের দর কষাকষির শিকড় কতদূর বিস্তৃত।

এএন