মতলবে এক বাগানেই ১৫০ জাতের আঙুর, ইকরামের সফলতা

ওমর ফারুক পারভেজ, মতলব (চাঁদপুর) প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

চাকরির পেছনে আর নয় ছুটোছুটি। এমন কিছু করতে হবে, যা করে নিজের অর্থনৈতিক সফলতার পাশাপাশি অন্য তরুণরাও হবে উৎসাহিত। বেকারত্বের অভিশাপকে পাশ কাটিয়ে অল্প পুঁজিতে তারাও হবে স্বাবলম্বী।

এমন চিন্তা থেকেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছোট হলদিয়া গ্রামের ইকরাম খান গড়ে তুলেছেন আঙুরের বাগান। প্রবাসী ভাইয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা একটি আঙুরের চারা দিয়ে শুরু হওয়া সেই বাগানে এখন রয়েছে ১৫০ জাতের আঙুরগাছ। এক বাগানে একসঙ্গে এত জাতের আঙুরের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক মানুষ বাগানটি দেখতে আসছেন।

এক মৌসুমেই চারা ও আঙুর বিক্রি করে তিনি আয় করেছেন ৯ লাখাধিক টাকা।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর সাবেক উপ-প্রকৌশলী সায়েদুল ইসলাম খানের ছেলে ইকরাম খান। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ ফরাজীকান্দি ইউনিয়নের ছোট হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার।

ছোট হলদিয়া গ্রামে স্থানীয় একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশে ১৮ শতক পৈতৃক জমিতে তার এই ব্যতিক্রমী আঙুর বাগান। মালচিং পদ্ধতিতে গড়ে তোলা বাগানে সারি সারি গাছে ঝুলছে লাল, সবুজ, হলুদসহ নানা রঙের আধাপাকা ও পাকা আঙুরের থোকা। দূর থেকেই যে কারও নজর কাড়ে নানা রঙের আঙুর।

ব্যতিক্রমী এই আঙুরচাষি ইকরাম খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ২০১৯ সালে এইচএসসি পাস করার পর আর পড়াশোনা এগোয়নি। চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাননি। চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই ভিন্ন কিছু করার চিন্তা থেকেই মাঠে নামেন। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে থাকা বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া থেকে একটি আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন। সেটি বাড়ির ছাদে লাগানোর এক বছর পর গাছে ফল আসে। থোকায় থোকায় আঙুর দেখে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় তরুণরাও উৎসাহিত হয়ে তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে বাগান করার চেষ্টা করছেন।

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশ থেকে অনলাইন ও লোকমারফত ১৫০টি উন্নত জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন। পরে পৈতৃক ১৮ শতক জমিতে গড়ে তোলেন পূর্ণাঙ্গ একটি আঙুর বাগান। বর্তমানে এই বাগানে ব্ল্যাক ম্যাজিক, গ্রিনলন, ভ্যালেজ, সুপারনোভা, অ্যাঞ্জেলিকাসহ প্রায় ১৫০ জাতের আঙুরগাছ রয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাগানে আঙুর পাকা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৬০০ কেজির বেশি পাকা ও আধাপাকা বিষমুক্ত আঙুর উৎপাদন হয়েছে বলে জানা যায়। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৩ লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি আকর্ষণীয় ও নানা জাতের আঙুরের চারা বিক্রি করে আয় করেছেন আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে তার মোট আয় প্রায় ৯ লাখাধিক টাকা। তার এই উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অনেক তরুণই উৎসাহিত হয়ে তার বাগান থেকে চারা নিয়ে বাগান করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার বাগানে মূলত মিষ্টি জাতের বিভিন্ন আঙুরের চারার চাহিদা বেশি। ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের চারা রয়েছে তার বাগানে।

উদ্যোক্তা ইকরামের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, এই বাগানের আঙুর বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। ফলগুলো অতি মিষ্টি, রসালো ও বিষমুক্ত হওয়ায় মানুষ সরাসরি বাগানে এসেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া অনলাইনেও চারা ও ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি সেভাবেও বিক্রি করছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম জানান, পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে সফলতা আসবেই, আর ইকরাম তার অন্যতম উদাহরণ। একটি চারা থেকে আজ সে একটি বড় আঙুর বাগান গড়ে তুলেছে। আমরা চাই স্থানীয় তরুণরা উৎসাহিত হয়ে তারাও এরকম বাগান গড়ে তুলুক।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, ইকরামের বাগান কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। বিষমুক্ত ও সুস্বাদু আঙুর চাষ করে ইকরাম এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমার বিশ্বাস, স্থানীয় তরুণরাও এখান থেকে উৎসাহিত হয়ে আঙুরের বাগান গড়ে তুলবে। আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সাধ্যমতো সহযোগিতা করব।

এএন