নতুন সাজে রূপ নিচ্ছে বরিশাল

আরিফ হোসেন, বরিশাল প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম

নতুন রূপ ও সৌন্দর্যে সেজে উঠছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিভাগীয় শহর বরিশাল। বছরের পর বছর ধরে হকার ও অবৈধ দখলদারদের কবলে থাকা ফুটপাত, বিনোদন কেন্দ্র এবং লেকগুলো দখলমুক্ত করতে ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। এর ফলে নগরবাসী ও বিনোদনপ্রেমীদের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও, উচ্ছেদ হওয়া হাজারো ভাসমান ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র সংশয়।

ঐতিহাসিক বেলস পার্ক (বঙ্গবন্ধু উদ্যান) রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং চারপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনার কারণে একসময় তার নিজস্ব রূপ হারাতে বসেছিল। শুধু বেলস পার্কই নয়, শহরের প্রাণকেন্দ্র সদর রোড, বিবির পুকুর পাড় ও চৌমাথা লেকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলে ছিল। বিগত সরকারের পতনের পর সাবেক প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার নগরের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি।

পরবর্তীতে দেশ পরিচালনায় নতুন সরকার গঠিত হলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগরীর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।

বর্তমানে বিসিসির ধারাবাহিক অভিযানে বেলস পার্ক, বিবির পুকুর পাড় ও চৌমাথা লেকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বেলস পার্কের প্রবেশপথে বসানো হয়েছে সুদৃশ্য রেলিং গেট। একসময় যেখানে হকারদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাই কঠিন ছিল, সেখানে এখন বইছে স্বস্তির বাতাস। বিবির পুকুর পাড় কিংবা চৌমাথা লেক, সবখানেই এখন উন্মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

বেলস পার্কে বেড়াতে আসা নগরীর সদর রোডের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, “আগে এখানে এসে শান্তিতে বসার বা হাঁটার পরিবেশ ছিল না। চারদিকে চটপটি-ফুচকার দোকান আর হকারদের উচ্চ শব্দে কান পাতা যেত না। এখন অনেক পরিচ্ছন্ন লাগছে, বাচ্চাদের নিয়ে নির্ভয়ে হাঁটা যাচ্ছে। আমরা চাই এই পরিবেশ যেন সবসময় বজায় থাকে।”

তবে এই স্বস্তির উল্টো পিঠে রয়েছে হাজারো পরিবারের দুশ্চিন্তা। সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, মহানগরী এলাকায় ভাসমান দোকানের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। আকস্মিক এই উচ্ছেদে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিনের খেলনা বিক্রেতা মো. খলিল মিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “হঠাৎ কইরা আমাগো দোকানগুলা ভাইঙ্গা দিল। এই দোকান দিয়াই আমার পাঁচজনের সংসার আর পোলাপানের পড়াশোনার খরচ চলত। এহন আমি কই যামু, কি করুম? আমাগো উচ্ছেদ করার আগে তো একটা ব্যবস্থা কইরা দেওয়া উচিত আছিল।”

সচেতন মহলের মতে, পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলা কমিটির সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “ফুটপাত ও বিনোদনকেন্দ্র দখলমুক্ত করা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। হঠাৎ এত মানুষ বেকার হয়ে পড়ায় নগরীতে অপরাধ বৃদ্ধির একটা আশঙ্কাও থেকে যায়। তাই মানবিক কারণে দ্রুত তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান করা জরুরি।”

ফুটপাত উচ্ছেদের পাশাপাশি থমকে থাকা রাস্তা ও ড্রেন সংস্কারের কাজ পুনরায় চালু করেছেন বিসিসি প্রশাসক। বিভিন্ন ওয়ার্ডের পানিসমস্যা দূরীকরণ, ময়লাখোলার স্থান পরিবর্তন এবং প্ল্যানিংয়ের জটিলতা সমাধানসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজে হাত দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, নগরীর বেলস পার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্রগুলোকে আর কোনোভাবেই দখল হতে দেওয়া হবে না। নগরবাসীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর শহর উপহার দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। তবে আমরা ভাসমান ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনা করছি, তাদের পুনর্বাসনের জন্য ইতিমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জেএইচআর