কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল আজও উন্নয়নের মূলধারা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। নদীবেষ্টিত এই জনপদের হাজারো মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের অন্যতম কারণ দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, চরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্র।
দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন চর ও নদীঘেরা এলাকার মানুষকে প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসায়িক কাজে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। অনেক সময় জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে বিলম্ব হয়, শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারে না এবং কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি ছোট নদী বা খালের কারণে অনেক সময় কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে গন্তব্যে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ- দুইয়েরই অপচয় হয়। বিশেষ করে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ধান, পাট, গম, ভুট্টা, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা সহজে বড় বাজারে পণ্য পৌঁছাতে পারেন না। ফলে অনেক সময় স্থানীয় আড়তদারদের কাছে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। একটি সেতু নির্মিত হলে পরিবহন ব্যয় কমবে, দ্রুত বাজারজাতকরণ সম্ভব হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু কৃষি নয়, শিক্ষা ক্ষেত্রেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “চরাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পারাপার হয়ে স্কুল-কলেজে যায়। খারাপ আবহাওয়া বা নদীর স্রোত বেড়ে গেলে অনেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। এছাড়া যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষকও নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারেন না। একটি সেতু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত করবে।”
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। স্থানীয়রা জানান, প্রসূতি মা, বৃদ্ধ ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয়। রাতের বেলায় নৌযান না পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একটি সেতু নির্মিত হলে জরুরি চিকিৎসাসেবা দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, “সেতু নির্মাণ হলে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হবে। গড়ে উঠতে পারে ছোট শিল্পকারখানা, হাট-বাজার ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা উদ্যোগ। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে।”
উন্নয়নের এই যুগে চরাঞ্চলের মানুষ আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিক সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মান্নান বলেন, “একটি সেতু শুধু দুই পাড়কে যুক্ত করবে না, এটি মানুষের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।”
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুখারঘাটে ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রার্থীদের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ভাগজোত ও সুখারঘাট সেতু নির্মাণ। পাশাপাশি চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতের উন্নয়নেরও নানা আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্বাচনের পরও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা আসাদ উল্লাহ বাচ্চু বলেন, “সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন পেলেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য বলেন, “ভাগজোত ও সুখারঘাট সেতু এবং নদীভাঙন সমস্যা আমার উপজেলার অন্যতম বড় সংকট। বিষয়টি আমি সংসদে উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছেও ডিও লেটার দিয়েছি। দ্রুত সেতু নির্মাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
চরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, বহুদিনের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। তাদের বিশ্বাস- একটি ব্রিজই বদলে দিতে পারে দৌলতপুরের চরাঞ্চলের ভাগ্য।
এএন