ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রদলে যোগদানের ১৯ দিনেই পদ হারালেন ‘ফেন্সি সামির’

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১১:৪২ এএম

কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ‘ফেন্সি সামির’-এর ছাত্রদলে যোগদান এবং মাত্র ১৯ দিনের মাথায় পদ হারানোর ঘটনা সাভারের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগের মধ্যেই তিনি সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ পান। তবে অতীত রাজনৈতিক পরিচয় ও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তাকে ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সামিরকে ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ জন্য প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সামিরের বাবা মরহুম মতিউর রহমান সাভার সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। একইভাবে সামিরও সাভার পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন বলে একাধিক স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সামির, তার ভাই হৃদয় হোসেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের বাড়িঘর চিহ্নিত করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগে স্থানীয়ভাবে সমালোচিত হন।

এছাড়া দেওগাঁও, চাঁপাইন ও রাজাশন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা, জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, সামির ও তার ভাই হৃদয় হোসেন ওরফে ‘ফর্মা হৃদয়’ ওই চক্রের নেতৃত্ব দিতেন এবং এলাকাজুড়ে সিসিটিভি নেটওয়ার্ক স্থাপন করে আধিপত্য বজায় রেখে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

ছাত্রদলের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই সামিরের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, ধর্ষণের অভিযোগ, কিশোর অপহরণ ও নির্যাতন, রিকশা গ্যারেজে হামলা চালিয়ে রিকশা লুট, চাঁদাবাজি, জমি ও ফ্ল্যাট দখল, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাং পরিচালনাসহ তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। সংগঠনের নেতারা জানান, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই।

বর্তমানে মাহাবুব হোসেন সামির কিশোর নির্যাতন ও রিকশা লুটের দুটি মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া আশুলিয়া থানায় দায়ের হওয়া জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলায় তিনি ১৫০ নম্বর এবং তার ভাই হৃদয় হোসেন ১৪৮ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। অন্যদিকে হৃদয় হোসেন ওরফে ‘ফর্মা হৃদয়’ দেড় কোটি টাকা মূল্যের হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাদক মামলায় কারাগারে রয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল আল মামুন বলেন, "মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আ. আল মামুন রাসেল বলেন, "অন্য মামলায় কারাগারে থাকা কোনো এজাহারভুক্ত আসামিকে তদন্তের স্বার্থে আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শোন অ্যারেস্ট করে জিজ্ঞাসাবাদের আইনি সুযোগ রয়েছে।"

এদিকে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল সামিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা উচিত।

এএন