“আমার বুকের ধন, আমার চোখের মণি, কোথায় চলে গেলি রে তুই! আমার বুকে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না আমার সোনার ছেলে।” রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভর পদক বুকে নিয়ে এভাবেই আহাজারি করছেন সাদিকের মা।
সাদিকের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “গতকাল বৃহস্পতিবার আমার বুকের ধন সাদিক ওর বাবার কাছে ফোন করে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিল। সাদিকের সঙ্গে আমার তিন দিন আগে কথা হয়েছিল। সামনে সপ্তাহে বাড়িতে আসবে বলে জানিয়েছিল। আমার সোনার ছেলে আর ‘মা’ বলে আমাকে ডাকবে না। আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকব? আমার ছেলে এভাবে চলে যাবে, আমি তা মেনে নিতে পারছি না। আমি আমার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।”
নিহত সাদিক রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামের মো. আশরাফ আলী শেখের ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সাদিক ছিলেন মেজো। তিনি সেরা ডুবুরি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফায়ার সার্ভিস পদক পেয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি চমৎকার ফুটবল খেলতেন। গোলরক্ষক হিসেবে গোয়ালন্দে সাদিকের পরিচিতি ছিল ব্যাপক।
জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার আট ঘণ্টা পর নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা সাদিকের মরদেহ উদ্ধার করেন। এর আগে বেলা ১১টার দিকে নগরীর নিতাইগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর ফায়ার ঘাট এলাকায় পন্টুনের সামনে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে গিয়ে স্পিডবোট থেকে পড়ে নিখোঁজ হন সাদিক হোসেন শুভ (২৬)। তিনি নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি ছিলেন। পানিতে ডুবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার করাই ছিল তার দায়িত্ব। সেরা ডুবুরি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ফায়ার সার্ভিস পদক লাভ করেন।
গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমির চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “সাদিক চমৎকার ফুটবল খেলতেন। গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমিসহ গোয়ালন্দের অনেক ফুটবল দলের গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। সাদিক একজন নম্র-ভদ্র ও ভালো ছেলে। তার অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।”
নিহত সাদিকের চাচা ও পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ফজলুল হক জানান, “আমরা জেনেছি, সাদিক নারায়ণগঞ্জ নদীতে ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ করছিলেন। তার সঙ্গে আরও তিনজন সদস্য ছিলেন। স্পিডবোটের সামনের দিকে থাকা ডুবুরি সাদিক ঢেউয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন। দীর্ঘ আট ঘণ্টা তল্লাশির পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে জুমার নামাজ শেষে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তার মরদেহ বাড়িতে এনে সন্ধ্যার পর জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাদিক নম্র, ভদ্র এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক ভালো একটি ছেলে। সাদিক দুই বছর আগে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীসহ পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমাদের দাবি, সাদিক একজন রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি। সে নদীতে ডুবে মারা যাবে- এমনটি হওয়ার কথা নয়। তার মৃত্যুর পেছনে রহস্য থাকতে পারে। প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”
এএন