বাসার ছাদে আনার বাগান করে সফল উদ্যোক্তা আল আমিন

বাসাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০২:৩২ পিএম

এক তরুণ উদ্যোক্তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চিলতে বিষাদ আর মায়ের প্রতি গভীর টান। মায়ের অসুস্থতার কারণেই মূলত তাঁর আনার চাষ শুরু করা। ২০২৩ সালে তাঁর মা যখন ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তখন চিকিৎসক তাঁকে নিয়মিত আনার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। বাজার থেকে কেমিক্যালমুক্ত নিরাপদ ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় নিজ বাসার ছাদে কয়েকটি আনার গাছ রোপণ করেন তিনি। আজ তাঁর মা পরপারে চলে গেলেও, তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। বলছিলাম টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিনের কথা।

আল আমিন (২৮) উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামের বজলুর রহমানের ছেলে।

জানা যায়, ২০২৩ সালটি আল আমিনের কাছে ছিল জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ। সে সময় তাঁর মা ক্যানসারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকেরা নিয়মিত আনার বা ডালিম খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের জন্য কেমিক্যালমুক্ত ফলের অভাব থেকেই আল আমিন সিদ্ধান্ত নেন নিজে আনার চাষ করার। প্রথমে বাড়ির উঠানের কোণে ছোট কয়েকটি চারা রোপণ করেন। পরে বাসার ছাদে ড্রামের মধ্যে আনার গাছ লাগান। ২০২৫ সালের মে মাসে আল আমিনের মা মারা যান। মায়ের মৃত্যু হলেও তাঁর রেখে যাওয়া আনার বাগানের পরিধি দিন দিন বেড়েছে। তাঁর নিজ হাতে তৈরি করা কলমের চারা এখন সারা দেশের মানুষের ছাদ বাগানে শোভা পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে শুধুমাত্র চারা বিক্রি করেই তাঁর ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

তরুণ উদ্যোক্তা আল আমিন জানান, ২০২৩ সালে মা ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ওই সময় তিনি একটি তৈরি পোশাক কারখানায় (গার্মেন্টস) চাকরি করতেন। মাকে চিকিৎসক আনার ফল খাওয়ানোর কথা বলেন। তখন বাজারে আনারের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, যা কিনে খাওয়ানো তাঁর জন্য বেশ কষ্টকর ছিল। তাছাড়া বাজারের ফলগুলোতে কেমিক্যাল থাকার ভয়ও ছিল। মাকে ভালো ও নিরাপদ ফল খাওয়ানোর তাগিদ থেকেই প্রথমে বাড়ির উঠানে আনারের চারা রোপণ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, শুরুতে ছাদে বাগান করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। পরে ইউটিউবে ছাদে আনার চাষের ভিডিও দেখে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে কয়েকটি ছোট চারা সংগ্রহ করেন এবং নিজের বাসার ছাদে ড্রামে রোপণ করেন। তখন ছাদে ওঠার মতো সিঁড়িও ছিল না। সেই চারা থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর ছাদ বাগান গড়ে ওঠে। মায়ের শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়ান। চাকরি ছাড়ার এক সপ্তাহের মাথায় তাঁর মা মারা যান। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই এই বাগান গড়ে উঠেছিল।

বর্তমানে আল আমিনের বাসার ছাদ ও মাটিতে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার আনারের চারা রয়েছে। এর মধ্যে ফলন্ত গাছগুলো রয়েছে ছাদে। তাঁর ছাদে ড্রামের মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বড় আনার গাছ রয়েছে, যেগুলোতে প্রচুর ফল ধরেছে। আনারের পাশাপাশি তিনি এখন ছাদে আঙুর, কমলা ও মাল্টার চাষও করছেন। তিনি নিজেই গাছগুলোর কলম করেন এবং চারা উৎপাদন করে বিক্রি করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তাঁর কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজেদের ছাদে বাগান তৈরি করছেন।

আল আমিনের বাগানে ভারতের মহারাষ্ট্রের সুপার ভাগোয়া, মৃদুলা, গুজরাটি আনার, থাইল্যান্ডের থাই আনার, অস্ট্রেলিয়ার আনার এবং পাকিস্তানি আনারসহ মোট ২৬টি জাতের সংগ্রহ রয়েছে। বাগানে চারাগুলোর মূল্য ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি মাসে সব খরচ বাদ দিয়ে তাঁর ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয় থাকে এবং কোনো কোনো মাসে চারা বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়ে। আল আমিন জানান, তিনি নিজেই তাঁর বাগানের সব কাজ করেন এবং প্রয়োজনবোধে শ্রমিক নেন। মায়ের কল্যাণে শুরু করা এই বাগানই আজ তাঁর ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, আল আমিন ছাদে আনার বাগান করে সফল হয়েছেন। মায়ের অসুস্থতার সময় অল্প পরিসরে শুরু করলেও এখন তাঁর বাগানের পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে তাঁর কাছ থেকে চারা নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই সাফল্য দেখে অন্য অনেকের মনেই এখন ছাদ বাগান করার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

বাগান দেখতে আসা হাবিবুল্লাহ শেফুল জানান, বাসার ছাদে এতো চমৎকার আনারের চাষ হতে পারে, তা তাঁর জানা ছিল না। তিনি খুব দ্রুতই আল আমিনের পরামর্শ নিয়ে নিজের বাসার ছাদে একটি আনার বাগান গড়ে তুলবেন।

বাসাইল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু ইলিয়াস তালুকদার জানান, আল আমিন উপজেলার একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি বাসার ছাদে আনারের বাগান ও চারার কলম তৈরি করে বিক্রি করছেন। তাঁর বাগানের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে এবং তিনি প্রতি মাসে ভালো আয় করছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্ন সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে এলাকার অনেক তরুণই এখন ছাদ বাগান করতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

জেএইচআর