দেশের উন্নয়ন বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাইলফলক হিসেবে পরিচিত মেট্রোরেল, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নের মতো শীর্ষ ১০টি মেগা প্রকল্প থেকেই ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় এই সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। চলতি অর্থবছরের মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ১০টি প্রকল্পের জন্য বিপুল বরাদ্দ রাখা হলেও বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশিত হারে কাজ এগোয়নি। ফলে বিশাল অংকের টাকা অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কায় এই বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে মেট্রোরেলের কাজ। ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন এক অর্থাৎ বিমানবন্দর রামপুরা মতিঝিল প্রকল্পের বরাদ্দ অবিশ্বাস্যভাবে ৯১ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। এই প্রকল্পে ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা মাত্র ৮০১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন ছয় এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন পাঁচ উত্তরাংশ প্রকল্প থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৩ শতাংশ। ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকার বিপরীতে এখন বরাদ্দ থাকছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প থেকে ৭৩৩ কোটি এবং বিমানবন্দর গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প থেকে ২৫৬ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা সিলেট চার লেন মহাসড়ক, সিরাজগঞ্জ রংপুর চার লেন মহাসড়ক এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের বরাদ্দও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা হয়েছে। মূলত জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে এসব প্রকল্প সময়মতো এগোতে পারছে না।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই কাটছাঁটের নেপথ্যে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক নয়। বছরের শুরুতে মোটা দাগে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক বিভাগ তা খরচ করার সক্ষমতা দেখাতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় পরিস্থিতি বেশ নাজুক। ফলে কৃচ্ছ্রসাধন নীতির অংশ হিসেবে উন্নয়ন বাজেটের আকার কমিয়ে আনা হচ্ছে। তবে সব প্রকল্প থেকে বরাদ্দ কমলেও ব্যতিক্রম হিসেবে থাকছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। রাশিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে মূল বরাদ্দের ১০ হাজার ১১ কোটি টাকাই বহাল রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নির্মাণাধীন ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। এখন ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এর আকার ২ লাখ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর মধ্যে দেশজ উৎস থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং প্রকল্প সহায়তা বা বৈদেশিক ঋণ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়া হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে দেখছেন মিশ্র দৃষ্টিতে। তিনি বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁটের ইতিবাচক দিক হলো অপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নেতিবাচক দিকটি হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকা।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের ধীরগতির কারণে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায় এবং এর ফলে দেশ যে অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা ব্যাহত হয়। তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাব আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় সমস্যা। অন্তর্বর্তী সরকার বড় বড় প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও উপযোগিতা যাচাইয়ের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট তারই একটি প্রতিফলন। তবে বড় প্রকল্পগুলোতে বিদেশি ঋণের যে দায় থাকে, তা সময়মতো বাস্তবায়ন না হলে সুদের বোঝা আরও ভারী হতে পারে। তাই কেবল বরাদ্দ কমানোই নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ফেরানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত আকার ২ লাখ কোটি টাকা করা হচ্ছে এবং মেগা প্রকল্প থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা কমানো হচ্ছে যেখানে ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন এক প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি হ্রাস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
জেএইচআর