দেশে রান্নার গ্যাসের প্রধান উৎস তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, অন্যদিকে আমদানিতে বড় ধরনের পতন, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্যে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
গত এক বছরে আমদানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা, উল্টো সরবরাহ কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। ফলে সংকটের সুযোগে কোথাও কোথাও সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে, আবার কোথাও টাকা দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস।
প্রবৃদ্ধির বদলে পতন বাংলাদেশে প্রতি বছর এলপিজির চাহিদা গড়ে ১০ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট এবং নতুন সংযোগ বন্ধ থাকায় গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে কয়েক গুণ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। ২০২৫ সালে চাহিদা অনুযায়ী আমদানি ১৮ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আমদানি হয়েছে মাত্র ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন।
অর্থাৎ, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন। বিশেষ করে বছরের শেষ তিন মাসে আমদানির গ্রাফ ছিল নিম্নমুখী, যা বর্তমান বাজারের তীব্র সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিইআরসির সূত্রমতে, বছর শেষে যেটুকু আপৎকালীন মজুত থাকার কথা ছিল, তাও বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন বাজারের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস কোনো কোম্পানির হাতেই অবশিষ্ট নেই।
নেপথ্যের বহুমুখী কারণ এলপিজির এই সংকটের পেছনে কেবল দেশীয় অব্যবস্থাপনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ভূ রাজনীতি এবং লজিস্টিক জটিলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জাহাজ সংকট। এলপিজি পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে বড় একটি সংকট তৈরি করেছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। গত নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ১৭০টি বড় জাহাজের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এর ফলে সমুদ্রপথে এলপিজি পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, সরবরাহ উৎস বন্ধ হওয়া। বাংলাদেশ এলপিজির একটি বড় অংশ ইরান থেকে সংগ্রহ করত। কিন্তু বর্তমানে ইরান থেকে সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়লেও সেখানে চীন ও ভারতের মতো বড় ক্রেতারা সক্রিয় থাকায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
তৃতীয়ত, ডলার সংকট ও ঋণপত্র জটিলতা। আমদানিকারকদের মতে, দেশে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে সময়মতো ঋণপত্র বা এলসি খোলা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে গড়িমসি করায় আমদানির চেইনটি ভেঙে পড়েছে।
আমদানিকারকদের সংখ্যা ও সক্ষমতার অসমতা বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫২টি। তবে এই সংখ্যার আড়ালে বাস্তব চিত্রটি বেশ দুর্বল। সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে ৩২টি কোম্পানির। সরাসরি আমদানির সক্ষমতা আছে মাত্র ২৩টি কোম্পানির। গত বছর কোনো না কোনো সময় আমদানি করেছে মাত্র ১৭টি কোম্পানি।
আর প্রতি মাসে নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বিইআরসির কর্মকর্তাদের মতে, হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানির ওপর বাজারের এই অতি নির্ভরশীলতাই সংকটের সময় ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা অনিয়মিত আমদানিকারক, তারা সংকটের সময়ে লোকসান এড়াতে আমদানি বন্ধ করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর।
সরকারি অবহেলা ও লোয়াবের অভিযোগ এলপিজি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এর পক্ষ থেকে সংকটের জন্য সরাসরি সরকারি নীতিমালা ও দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়েছে।
লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক এক গোলটেবিল বৈঠকে অভিযোগ করেন যে, বাজারের চাহিদা মেটাতে তারা এক বছর আগেই আমদানির অনুমতি এবং নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের আবেদন করেছিলেন। তিনি বলেন, লোয়াবের পাঁচটি সদস্য কোম্পানি এক বছর আগে আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর অনুমতি চেয়েছিল। এক বছর পর মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে এটি বর্তমান নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত আগস্টে পুনরায় আবেদন করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, যখন সরকার বুঝতে পেরেছিল যে আমদানি কমছে, তখনই বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বিশেষ কোটায় আমদানির সুযোগ করে দেওয়া উচিত ছিল। সময়মতো সিদ্ধান্তের অভাবে আজ ভোক্তারা দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের হাহাকার রাজধানীসহ সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে এলপিজির দাম এখন সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই।
সিলিন্ডার প্রতি ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ টাকার বদলে অনেক জায়গায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা সরাসরি পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা পায় না, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে গেছে।
বর্তমান উদ্যোগ ও আগামীর প্রত্যাশা বিইআরসি এবং জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এলসি খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিইআরসি ইতোমধ্যেই আমদানিকারকদের আমদানির সীমা বা কোটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন করে এলপিজি আমদানির এলসি খুলতে শুরু করেছেন এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন চালান দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন চালানগুলো দেশে পৌঁছালে সরবরাহের ঘাটতি কমে আসবে এবং বাজার স্থিতিশীল হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য এলপিজি মজুতের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণের কোনো বিকল্প নেই। এলপিজি এখন আর বিলাসী পণ্য নয়, এটি একটি জরুরি মৌলিক চাহিদা। আমদানিনির্ভর এই জ্বালানির সরবরাহ চেইনে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে পুরো দেশের রান্নাঘর স্থবির হয়ে পড়ে।
গত বছরের আমদানিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে সরকারের দ্রুত নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়ীদের আন্তরিকতা অত্যন্ত প্রয়োজন। অন্যথায় বাজার সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ভোক্তাদের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
জেএইচআর