ইইউ-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: ২০২৯ সালের পর কি বড় সংকটে পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত?

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

ভরত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার নতুন বাণিজ্যিক সমীকরণ বাংলাদেশের জন্য এক দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। একদিকে ইইউ ভারতের অধিকাংশ পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থগিত করেছে কমা অন্যদিকে গত ২৭ জানুয়ারি তারা দিল্লির সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির ফলে ২০২৭ সাল থেকে ভারতীয় পণ্য বিনাশুল্কে ইউরোপে প্রবেশ করবে কমা যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একচ্ছত্র আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারত থেকে আমদানিকৃত তৈরি পোশাক ও প্লাস্টিকসহ ৮৭ শতাংশ পণ্যের ওপর জিএসপি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করেছে। এই সাময়িক প্রতিবন্ধকতা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির মনে হলেও কমা ২৭ জানুয়ারির মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে ২০২৭ সাল থেকেই ভারত বিনাশুল্কে তাদের পণ্য ইউরোপে পাঠানোর সুযোগ পাবে। অর্থাৎ কমা জিএসপি সুবিধার অভাব ভারত মিটিয়ে নেবে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে।

বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইউরোপে অস্ত্র বাদে সব কিছু প্রকল্পের আওতায় শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। বিজিএমইএ এর জ্যেষ্ঠ সহ কমা সভাপতি ইনামুল হক খান মনে করেন কমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজার মোটামুটি সুরক্ষিত। তাঁর মতে কমা ভারতের সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও কমা আমাদের হাতে এখনো সময় আছে। তবে ২০২৭ সালে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার বাজারে আমরা অবশ্যই এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো।

আসল দুশ্চিন্তা শুরু হবে ২০২৯ সালের পর কমা যখন বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটাবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কমা এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবাদে শূন্য শুল্ক সুবিধা ভোগ করবে। 

গবেষণা সংস্থা র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন কমা বিশ্বের পরিবর্তিত ভূ কমা রাজনৈতিক অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়াতে ভারতের মতো বৃহৎ বাজারের দিকে ঝুঁকছে।

এতে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক অবস্থানের বড় পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি বা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। এই বিশাল বাজার ধরে রাখতে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন কমা ভারতকে মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশকে কেবল স্বল্পমেয়াদি সুবিধার দিকে তাকালে হবে না। তিনি বলেন কমা ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদি।

আমাদের এখন থেকেই জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে অথবা শক্তিশালী বাণিজ্যিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশেষ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে যেতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও ভারত অধিকাংশ পণ্যে জিএসপি স্থগিতের মুখে রয়েছে। কিন্তু ২০২৭ সালে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে এবং ২০২৯ সালে বাংলাদেশের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক বসলে বাজার হারানোর বড় ঝুঁকি তৈরি হবে।

ভারতের সাথে ইউরোপের এই মিতালি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। ধীরে চলো নীতি থেকে বের হয়ে এসে এখন থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করার লড়াই শুরু করতে হবে। অন্যথায় ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বাজারে মেড ইন বাংলাদেশ ট্যাগটি ভারতীয় সস্তা ও শুল্কমুক্ত পণ্যের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

জেএইচআর