চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়া নিয়ে চলমান উত্তেজনা ও দীর্ঘদিনের দর-কষাকষিতে এক নতুন মোড় এল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক দুবাই পোর্ট (ডিপি) ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কোনো চুক্তি সই হচ্ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে সরকার।
রোববার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে যে আন্দোলন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় তার অবসান ঘটল।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের হাতে আর মাত্র দুই কার্যদিবস সময় থাকায় এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সময় চাওয়ায়, এ মেয়াদে চুক্তি সইয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই।
সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরী জানান, আজ সকালেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি এসেছে। চিঠিতে কোম্পানিটি জানায়, তারা ইজারা চুক্তির খসড়া বা ‘কনসেশন এগ্রিমেন্ট’ হাতে পেয়েছে এবং তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে। তারা চলমান দর-কষাকষির অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
তবে চুক্তির শর্তগুলো আরও গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য তারা সরকারের কাছে অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, যেহেতু তারা সময় চেয়েছে এবং সরকারের মেয়াদ আর মাত্র দুই দিন, তাই এ সময়ের মধ্যে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা কার্যত অসম্ভব। ফলে বিষয়টি নির্বাচন পরবর্তী সরকারের হাতেই ন্যস্ত হতে যাচ্ছে।
এনসিটি টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার পর গত এক মাসে এ প্রকল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ের দর-কষাকষি শুরু হয়। তবে বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের একাংশের প্রবল বিরোধিতার মুখে বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।
আশিক চৌধুরী উল্লেখ করেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে এ নিয়ে অত্যন্ত নিবিড় কাজ হয়েছে। তবে চুক্তি সইয়ের মতো বড় সিদ্ধান্তের জন্য যে পরিমাণ সময় ও আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, তা বর্তমান সরকারের হাতে নেই।
উল্লেখ্য, এ এনসিটি ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে আজই চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, কোনোভাবেই যেন এ টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে লিজ দেওয়া না হয়। সরকারের আজকের এ ঘোষণার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের অচল অবস্থা নিরসনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দর-কষাকষি প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নির্বাচন শেষে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এ দর-কষাকষি পুনরায় শুরু হতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডও তাদের চিঠিতে আশা প্রকাশ করেছে যে, এ অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে সঠিক পথেই এগোবে।
বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তাঁরা দুজনেই নিশ্চিত করেন যে, বর্তমান সরকার তাড়াহুড়ো করে কোনো বড় জাতীয় সম্পদে বিদেশি বিনিয়োগ বা ইজারা চুক্তিতে যাচ্ছে না, বরং বিষয়টিকে আরও স্বচ্ছ ও লাভজনক করার সুযোগ রাখছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা ইস্যুটি এখন নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে নতুন আলোচনার জন্ম দেবে। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদে এ চুক্তি সই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় একদিকে যেমন শ্রমিক আন্দোলন প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বড় বিনিয়োগকারীর ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারই এখন ঠিক করবে, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ভাগ্য কার হাতে থাকবে।
ইএইচ