জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই ভাগে বিভক্ত করে আধুনিকায়নের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকার গ্রহণ করেছিল, তা আপাতত আলোর মুখ দেখছে না। ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক রশি টানাটানিতে আটকে গেছে এই সংস্কার উদ্যোগ। ফলে এনবিআর পুনর্গঠনের বিশাল এই চ্যালেঞ্জ এখন আগামী নির্বাচিত সরকারের কাঁধেই বর্তালো।
অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা এবং কর আহরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গত বছরের ১২ মে একটি ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি করেছিল সরকার। সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ— রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তীব্র আন্দোলনে নামেন। তাদের আপত্তির মুখে গত ১ সেপ্টেম্বর পরিমার্জিত অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। কিন্তু মূল সংকটের সমাধান মেলেনি।
মন্ত্রণালয় ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সচিব পর্যায়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও এনবিআর বিভক্তি নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মূল জটিলতা দেখা দিয়েছে পদের ভাগাভাগি নিয়ে বিভক্তির পর গঠিত দুটি পৃথক বিভাগের সচিব পদে কোন ক্যাডার থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে রেষারেষি। আমলাতান্ত্রিক এই জটিলতা নিরসন করতে না পারায় চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে গেছে।
এনবিআর সংস্কারের এই ব্যর্থতাকে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় ‘পিছুটান’ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, পর্যাপ্ত সময় ও জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন এটি বাস্তবায়ন করা গেল না, তা এক বড় প্রশ্ন।
ড. জাইদী সাত্তার (চেয়ারম্যান, পিআরআই) বলেন, জাতীয় স্বার্থে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকা দুঃখজনক। সরকার পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তৎপরতার অভাব ছিল। এই ব্যর্থতার দায়ভার অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান (সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি) বলেন, “আমরা অনেকটা ঘুমন্ত অবস্থায় ঋণের ফাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় না বাড়লে নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য পরিস্থিতি আত্মঘাতী হবে। নতুন সরকারকে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে রাজস্ব কর্মকর্তারাও সংস্কারে মানসিকভাবে উৎসাহিত বোধ করেন।
বর্তমানে এনবিআর বিভক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত থাকা কর্মকর্তাদের লঘু দণ্ড দিয়ে পুনর্বহালের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকের বেতন দুই ধাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে করে সংস্কারের মূল চেতনা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য প্রথম বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে এই ‘রাজস্ব সংস্কার’ বাস্তবায়ন করা। রাজস্ব আহরণে গতি না এলে দেশের ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এএন