সংকট থেকে স্থিতিশীলতা 

আইএফআইসি ব্যাংকের পুনরুত্থান ও গ্রাহক আস্থার নয়া দিগন্ত

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম প্রাচীন ব্যাংক আইএফআইসি এক সময় গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই সময়ে ঋণ প্রদানে অনিয়ম এবং সুশাসনের চরম অভাবে আমানতকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। 

২০২৪ সালের জুলাই থেকে পরবর্তী তিন মাসে ব্যাংকটি প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার আমানত হারিয়েছিল। গ্রাহকদের মনে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠা তখন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল।

তবে ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এই একটি সিদ্ধান্তই ছিল ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর মূল ভিত্তি।

সুশাসন ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার

২০২৫ সালটি ছিল আইএফআইসি ব্যাংকের জন্য 'নিরাময় কাল'। পরিচালনা পর্ষদ সংস্কারের পর ব্যাংকটি আমানতকারীদের আস্থা অর্জনে নিরলস কাজ শুরু করে। ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসেই ব্যাংকটি শক্তিশালী দুই অংকের প্রবৃদ্ধি দেখাতে সক্ষম হয়। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট আমানত ৫১,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা সংকটের সময়ের তুলনায় প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বেশি।

আস্থা ফেরার মূল কারণসমূহ-

পর্ষদ সংস্কার: সালমান এফ রহমানের দখলমুক্ত হওয়ার পর পেশাদার ও দক্ষ ব্যক্তিদের পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
স্বচ্ছতা: প্রতিটি ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়, যা গ্রাহকদের মনে নতুন করে বিশ্বাসের জন্ম দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা: মারাত্মক প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইএফআইসি-কে 'ফরবিয়ারেন্স' বা বিশেষ সুবিধা প্রদান করে, যা তাদের কার্যক্রম সচল রাখতে সাহায্য করে।

২০২৬ সালের বর্তমান কার্যক্রম ও বিজনেস কনফারেন্স

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আইএফআইসি ব্যাংক কেবল আমানত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা তাদের ব্যবসায়িক পরিধি বাড়াতেও অত্যন্ত সক্রিয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকটি দেশজুড়ে বিভিন্ন বিজনেস কনফারেন্স এবং উপশাখা বিজনেস কনফারেন্স পরিচালনা করেছে।

বিশেষ করে ব্যাংকটি তার ১,২০০টিরও বেশি উপশাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রামীণ এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণ ও এসএমই (SME) কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই নেটওয়ার্কটিই এখন ব্যাংকটির আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হতে যাচ্ছে।

স্টার্টআপ ফান্ডের ঐতিহাসিক চেক হস্তান্তর

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আইএফআইসি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির অংশ হিসেবে ব্যাংকটি ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার একটি চেক বাংলাদেশ ব্যাংকে হস্তান্তর করে। এটি প্রমাণ করে যে, ব্যাংকটি কেবল তার অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে ওঠেনি, বরং দেশের উদ্ভাবনী অর্থনীতি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিকাশেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।

মূলধন পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আমানত বাড়লেও আইএফআইসি ব্যাংকের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূলধন ঘাটতি। ১৭,০০০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি নিয়ে ব্যাংকটি বর্তমানে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।

আগামীর কৌশল-

সরকারি সহায়তা: আইএফআইসি ব্যাংকে সরকারের ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মনসুর মোস্তফা সরকারের কাছ থেকে মূলধন সহায়তা নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

কৌশলগত বিনিয়োগকারী: আর্থিক সূচকগুলো আরও শক্তিশালী করার পর ব্যাংকটি দেশি-বিদেশি কৌশলগত বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা করছে।

এসএমই খাতে মনোযোগ: ব্যাংকটি এখন বড় কর্পোরেট ঋণের পরিবর্তে নিরাপদ এবং লাভজনক এসএমই খাতের দিকে বেশি ঝুঁকেছে।

মালিকানা পরিবর্তন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং

২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি ব্যাংকটির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৈনিক আমার সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি এখন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক দখলমুক্ত হয়ে পুনর্গঠিত হয়েছে। আমানতকারীরা এখন নিশ্চিত যে তাদের টাকা কোনো নির্দিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থে ব্যবহার করা হবে না।

আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি-র এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি বাংলাদেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের জন্য অনুপ্রেরণা। আমানতকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়া যে কোনো ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ, যা আইএফআইসি সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ২০২৬ সালের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটি বলা যায় যে, ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি শক্তিশালী একটি আগামীর ভিত্তি স্থাপন করেছে।

এএন