দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসিl বর্তমানে এক নজিরবিহীন তারল্য সংকটের (Liquidity Crunch) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাংকটির আমানত প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দৈনন্দিন দায় পরিশোধে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি (Systemic Risk) এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘অর্ডার ১৯৭২’-এর বিশেষ ক্ষমতাবলে ব্যাংকটিকে ৫ হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে।
মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ও ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঋণের প্রকৃতি, শর্ত এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান ব্যালেন্স শিটের অবস্থাl নিয়ে আর্থিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের এই সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে-
বিপুল অঙ্কের আমানত প্রত্যাহার (Bulk Deposit Withdrawal): গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কিছু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা তাদের স্থায়ী আমানত (FDR) এবং চলতি হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছে। কোনো একটি ব্যাংকের মোট আমানতের একটি বড় অংশ যখন অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে (Deposit Concentration Risk), তখন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ তুলে নিলে ব্যাংকের নগদ প্রবাহে তাৎক্ষণিক টান পড়ে।
আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে আস্থার সংকট: প্রিমিয়ার ব্যাংক যখন আমানত প্রত্যাহারের চাপে পড়ে, তখন তারা কল মানি মার্কেট (Call Money Market) বা আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করে। কিন্তু উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং পূর্ববর্তী পর্ষদের অনিয়মের খবরের কারণে অন্যান্য ব্যাংক তাদের তহবিল ধার দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থতা: তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিতব্য CRR (Cash Reserve Ratio) এবং SLR (Statutory Liquidity Ratio) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়। নিয়ম অনুযায়ী ৪% নগদ এবং ১৩% তরল সম্পদ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও প্রিমিয়ার ব্যাংক সেই সীমা বজায় রাখতে পারছিল না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রেপো (Repo) বা বিশেষ তারল্য সহায়তার মাধ্যমে তহবিল দেয়। তবে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬ (৪) (ডি) এবং ১৭ (১) (বি) ধারা অনুযায়ী এই বিশেষ ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই ধারাগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে 'ঋণদাতার শেষ আশ্রয়স্থল' (Lender of Last Resort) হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুবিধাটিকে 'ওভারনাইট-ওডি' (Overnight Overdraft) হিসেবে অভিহিত করেছে। এর অর্থ হলো, প্রতিদিনের লেনদেন শেষে ব্যাংকটির যদি কোনো ঘাটতি থাকে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করে দেবে।
তবে শর্ত অনুযায়ী, ব্যাংকটি যদি দেউলিয়া বা অবসায়িত হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ৫ হাজার কোটি টাকা সবার আগে পরিশোধ করতে হবে (First Priority Charge on Assets)। এটি আমানতকারীদের জন্য এক ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করলেও ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।
১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রিমিয়ার ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট মহলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল। গত বছর (২০২৫) বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেয়। যদিও বর্তমান চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান দাবি করছেন যে, ব্যাংকটি এখন আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছ এবং কোনো অনিয়ম হচ্ছে না, তবে অতীতের অদক্ষ ঋণ বিতরণ (Bad Loans) এবং অনাদায়ী বিনিয়োগের বোঝা এখনো ব্যাংকটির ব্যালেন্স শিটকে দুর্বল করে রেখেছে।
‘একটি ব্যাংকের আস্থা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রিমিয়ার ব্যাংক বর্তমানে সেই ট্রানজিশন পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় আমানতকারীরা যখন আতঙ্কিত হয়ে টাকা তুলে নেয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছাড়া ব্যাংকটিকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।— আরিফ হোসেন খান, মুখপাত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক।
আজকের দিন পর্যন্ত প্রিমিয়ার ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে ৫ হাজার কোটি টাকার জোগান পাওয়ার পর ব্যাংকটি তাদের অনলাইন ট্রানজ্যাকশন এবং এটিএম বুথগুলোতে নগদ টাকার প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
আগামী দিনে ব্যাংকটির সামনে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ-
আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সহায়তা সাময়িক। ব্যাংকটিকে যদি টেকসই হতে হয়, তবে নতুন করে আমানত সংগ্রহ করতে হবে।
ঋণ আদায় বৃদ্ধি: কুঋণ বা খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy) সংকটে পড়বে।
পরিচালন ব্যয় কমানো: উচ্চ সুদে (১১.৫%) কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ায় ব্যাংকের নিট মুনাফার মার্জিন (Spread) সংকুচিত হয়ে আসবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রিমিয়ার ব্যাংককে দেওয়া এই বিশাল অংকের সহায়তা প্রমাণ করে যে দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর একটি বড় চাপ। যদি এই ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েও ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে একীভূতকরণ (Merger) বা অধিগ্রহণের (Acquisition) মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক বর্তমানে ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে বললেও ভুল হবে না। ৫ হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ সহায়তা ব্যাংকটিকে তাৎক্ষণিক দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করেছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন সুশাসন এবং দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা। সাধারণ আমানতকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে যে, তারা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
এএন