মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের যে কালো মেঘ জমেছিল, তা কাটতে শুরু করেছে বাংলাদেশের আকাশে। দীর্ঘ ৪০ দিনের উৎকণ্ঠা আর বিপণন শঙ্কার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে ভিড়েছে অকটেনবাহী প্রথম জাহাজ। 'এমটি সেন্ট্রাল স্টার' নামের এই জাহাজটি আসার মাধ্যমে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভিটল ‘এর মাধ্যমে আসা এই জাহাজটি মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। এটি মূলত যুদ্ধ শুরুর পর দেশে আসা অকটেনের প্রথম একক বড় চালান।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান জানিয়েছেন, জাহাজটি বন্দরে ভেড়ার পর এখন কারিগরি পরীক্ষা ও ল্যাব টেস্টের প্রক্রিয়া চলছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে অকটেন খালাস করে তা মূল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে। তাঁর মতে, বর্তমানে দেশে অকটেনের বড় কোনো ঘাটতি নেই, তবে এই নতুন চালানটি আগামী দিনগুলোর জন্য বাফার স্টক বা আপৎকালীন মজুত হিসেবে কাজ করবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস এবং মোটরসাইকেলের প্রধান জ্বালানি অকটেনের জন্য হাহাকার দেখা দেয় রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে।
গত এক মাসে অনেক ফিলিং স্টেশনে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেক স্টেশনে ‘অকটেন নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মার্চ মাসে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের জাহাজ এলেও অকটেনের কোনো জাহাজ আসার পূর্বনির্ধারিত সূচি ছিল না। এছাড়া যুদ্ধের কারণে আরও ৭টি জ্বালানিবাহী জাহাজের আগমন পিছিয়ে যায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে বার্ষিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ করা হয় অকটেন দিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছিল। এর একটি বড় অংশ (প্রায় অর্ধেক) স্থানীয়ভাবে রিফাইনারিতে উৎপাদিত হলেও বাকিটা আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অকটেনের মজুত ছিল ১০,৫২৬ টন। প্রতিদিন গড়ে ১,২২২ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এপ্রিলে দৈনিক গড় বিক্রি ১,১১৪ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই নতুন ২৬ হাজার টনের চালানটি দেশে আসায় দৈনিক চাহিদার হিসেবে আরও প্রায় ২০-২২ দিনের বাড়তি জোগান নিশ্চিত হলো।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের ডামাডোলে আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়ার হার এবং বীমা খরচ অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আজ আসা এই অকটেনের চালানটি মূলত সেই স্থবিরতা কাটানোর প্রথম পদক্ষেপ।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ এবং আকাশপথে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের খরচ সমন্বয়ে সুবিধা হবে। যদিও এই এক চালান দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হবে না, তবে এটি ভবিষ্যতের সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সিগন্যাল।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির যে ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে, তার সাথে মিল রেখে জ্বালানি সরবরাহে এই অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় আশার খবর। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এখন আরও কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজের অপেক্ষা রয়েছে। এমটি সেন্ট্রাল স্টার-এর এই ২৬ হাজার টন অকটেন কেবল জ্বালানি নয়, বরং একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সচল থাকার সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এম জি