কার পাল্লায় কত ঋণ

সরকারের ঋণের বোঝা ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল

শাহিনুর রহমান, ঢাকা প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম
ছবি: জিমিনি

দেশে সরকারি ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে ঋণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সরকারের অবদান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

  • শেখ হাসিনা সরকারের ঋণ= ১৯,২৩,০০০ কোটি টাকা।
  • অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঋণ=  তিন লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।
  • বিএনপি সরকারের (দেড় মাসে) ঋণ= ৪০,৭৫৬ কোটি টাকা।

সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকার মাত্র দেড় মাসেই ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪০ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকলেও একই সময়ে সরকারের ঋণগ্রহণ বাড়ায় অর্থনীতিতে নতুন চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। পরবর্তী ১৫ বছরে এই ঋণ ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে। ক্ষমতা ছাড়ার সময় মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের বড় অংশ।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম এক বছরেই প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা নতুন ঋণ নেয়। এতে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৬৮ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা ৩১ মার্চ শেষে বেড়ে হয় ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে এবং ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে।

দেশে সরকারি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বর শেষে ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতে সরকার এখন অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর বেশি নির্ভর করছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়-এর বুলেটিন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা নতুন ঋণ যুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে যেখানে মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, তা ছয় মাসেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

বর্তমানে মোট ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অংশ ৫৭ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ ৪৩ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার ৬২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। একই সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধ ২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ২৫৩ কোটি টাকায়।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বর্তমানে ব্যবসা পরিস্থিতি দুর্বল থাকায় তাৎক্ষণিক প্রভাব কম, তবে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা এর পেছনে বড় কারণ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আগামী জুন পর্যন্ত সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

বর্তমানে সরকারের মোট ঋণ প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্রে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এবং দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।

এই বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি, বৈশ্বিক চাপ এবং উচ্চ ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকনির্ভর ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে-যা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের অর্থপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জেএইচআর