হোসেন জিল্লুর রহমান

বাজেটে ‘জনপ্রিয়তা’ নয়, অর্থমন্ত্রীর ‘সফলতা’ জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় বাজেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে সস্তা ‘জনপ্রিয়তা’ অর্জনের চেষ্টার চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘সফলতা’ দেখানোর বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরাজমান গভীর আস্থা সংকট দূর করাই হওয়া উচিত এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত এক বিশেষ প্রাক-বাজেট গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অর্থনৈতিক সংকট ও আগামী বাজেট: জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এই বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, উন্নয়ন গবেষক এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরা অংশ নেন।

উচ্চাভিলাষী বাজেট নয়, প্রয়োজন ‘স্বস্তির বাজেট’

গোলটেবিল বৈঠকে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই মুহূর্তে দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো একটি ‘স্বস্তির বাজেট’। কোনো ধরনের কাল্পনিক লক্ষ্যমাত্রা বা উচ্চাভিলাষী সংখ্যাতত্ত্বের বাজেট এই মুহূর্তে দেশের জনপ্রত্যাশা নয়। সাধারণ মানুষ এখন বাজারে গিয়ে কিংবা দৈনন্দিন জীবন চালাতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে। তাই বাজেটে মানুষের এই আয়-ব্যয়ের বাস্তব সংগতির বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একজন জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখার চেয়ে, একজন সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখতে বেশি আগ্রহী। কারণ, সফলতার ওপরই নির্ভর করছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

তার মতে, দেশের ব্যবসায়ী, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা- সবার মধ্যেই এখন এক ধরনের আস্থার সংকট  বিরাজ করছে। আগামী বাজেটের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আস্থার সংকট কাটেয়ে ওঠা এবং অর্থনীতিতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি।

অর্থনীতির বড় ব্যাধি: বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট

বাজেট প্রণয়নের চেয়ে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের যে দুর্বলতা রয়েছে, সেটির ওপর কড়া আলোকপাত করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির নানা খাতেই এখন বহুমুখী সংকট দৃশ্যমান। তবে বাজেটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট হলো তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারা। প্রতি বছরই বড় বড় অংকের বাজেট ঘোষণা করা হয়, কিন্তু বছর শেষে দেখা যায় উন্নয়ন বরাদ্দের একটি বড় অংশই অপূর্ণ থেকে গেছে।

এই বাস্তবায়ন সংকট দূর করার উপায় বাতলে দিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে পারছি, ততক্ষণ এই বাস্তবায়নের সংকট দূর করা সম্ভব হবে না। রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংকিং খাত এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোর দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি না করলে বাজেট শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় তার সুফল পৌঁছাবে না।

নতুন ‘গ্রোথ ড্রাইভার’ হিসেবে কৃষির সম্ভাবনা

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন চালিকাশক্তি বা ‘গ্রোথ ড্রাইভার’ খোঁজার তাগিদ দেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় চালক হিসেবে কাজ করছে সেবা খাত । কিন্তু একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য শুধু সেবা খাতের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের নতুন গ্রোথ ড্রাইভার লাগবে।

তিনি প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে ‘কৃষি খাত’কে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন। ড. জিল্লুর বলেন, কৃষিকে প্রথাগত পর্যায় থেকে আধুনিক, প্রযুক্তিঘেরা ও বাণিজ্যিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। যদি আমরা কৃষিতে সঠিক নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দিতে পারি, তবে এটিই আগামী দিনে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হতে পারে।

উৎপাদন খাতের মন্দা ও নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগ

দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের সামগ্রিক বেসরকারি বিনিয়োগ এক ধরনের নিষ্ক্রিয় বা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন না, আর যারা আছেন তারাও হাত গুটিয়ে বসে আছেন।

এর নেতিবাচক প্রভাব উৎপাদন খাতে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উৎপাদন খাতের  প্রবৃদ্ধি দিন দিন কমে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও কোনো ভালো বার্তা নয়। উৎপাদন খাত সংকুচিত হলে কর্মসংস্থান কমবে, যা কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বড় বিপদের কারণ হবে। তাই আগামী বাজেটে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট কর ছাড় ও নীতি সহায়তা থাকা দরকার, যা নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত: ভবন নির্মাণ নয়, চাই সেবার মান

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে চিরাচরিত ধারণার বাইরে গিয়ে এক ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ হাজির করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই দাবি করি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কিন্তু বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়েও এই মুহূর্তে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা  বৃদ্ধি করা।

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ব্যয়ের সক্ষমতা ও সঠিক তদারকি না বাড়িয়ে যদি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কেবল বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে সেই টাকা মূলত বড় বড় ভবন ও অবকাঠামো তৈরিতেই অপচয় হবে। ইট-পাথরের ভবন তৈরিতে ঠিকাদারদের লাভ হলেও সাধারণ মানুষের তাতে কোনো প্রকৃত উপকার হবে না।

তিনি স্পষ্ট করেন যে, বরাদ্দ বাড়াতে হবে মূলত সেবার মান  বৃদ্ধির জন্য। হাসপাতালে রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে কি না, চিকিৎসকেরা থাকছেন কি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদান হচ্ছে কি না- সেইসব জায়গায় অর্থ খরচ নিশ্চিত করতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন না করে কেবল ভৌত অবকাঠামো বাড়ালে তা অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে কোনো কাজে আসবে না।

গোলটেবিলের সার্বিক সুর

প্রথম আলোর এই গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্য অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারাও ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে। এই অবস্থায় নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং পাচার হওয়া টাকা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি যেন কেবল আইএমএফ এর শর্ত পূরণ বা সস্তা রাজনৈতিক স্লোগানের বাজেট না হয়ে, দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলার একটি কার্যকর হাতিয়ার হয় গোলটেবিল বৈঠক থেকে অর্থমন্ত্রীর প্রতি সেই জোরালো তাগিদই দেওয়া হয়েছে।

এএন