তিন দফা দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনে বিভক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০২৫, ১২:০৪ এএম

সহকারী শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করা, শতভাগ পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী উচ্চতর গ্রেড প্রদানের তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আজ দ্বিধাবিভক্ত অবস্থায় পড়েছেন।

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে টানা তিন দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষকরা। 

অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদল সোমবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে অর্থ বিভাগ ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকের পর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শিক্ষকেরা আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন। তবে শহীদ মিনারে থাকা শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এ ঘোষণায় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত তারা নেননি, আলোচনা শেষে পরবর্তী অবস্থান জানাবেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। আলোচনায় জানানো হয়, সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাবটি জাতীয় বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং তা এখন কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ওপর নির্ভর করছে বলে জানায় অর্থ বিভাগ। একই সঙ্গে শতভাগ পদোন্নতির বিষয়েও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

তবে শহীদ মিনারে অবস্থানরত শিক্ষকদের একটি অংশ বলছে, সরকার এখনো কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাই আন্দোলন শেষ করা হচ্ছে না।

দুপুরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সারা দেশ থেকে আসা শিক্ষকরা ব্যানার হাতে অবস্থান করছেন। টাঙ্গাইলের গোপালপুর থেকে আসা এক সহকারী শিক্ষক বলেন, আমরা ক্লাস বন্ধ রাখতে চাই না, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবমূল্যায়িত হচ্ছি। বেতন কাঠামোতে ন্যায্যতা না আসা পর্যন্ত এখানেই থাকব।

জামালপুরের মেলান্দহ থেকে আসা আরেকজন শিক্ষক বলেন, শনিবার থেকে এখানে আছি। দাবি পূরণে পরিষ্কার ঘোষণা না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।

অন্যদিকে, আন্দোলনের প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। লালবাগ এলাকার এক প্রধান শিক্ষক বলেন, সহকারী শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন না, ফলে আমি একাই কয়েকটি ক্লাস নিচ্ছি। বার্ষিক পরীক্ষার আগে এটা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কা।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। সহকারী শিক্ষক পদ অনুমোদিত ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি, বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার শিক্ষক।

বর্তমানে সহকারী শিক্ষকেরা ১৩তম গ্রেডে বেতন পান, যেখানে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। ১১তম গ্রেডে মূল বেতন হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, আর ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা। সম্প্রতি আদালতের রায়ে ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে, যা সারা দেশের প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও শিক্ষক সমাজে একতার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে বার্ষিক পরীক্ষা ও শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবস্থান কর্মসূচিতে থাকা এক শিক্ষক সংক্ষেপে বলেন, আমরা রাষ্ট্রের কর্মচারী, কিন্তু আমাদের দাবি যেন রাষ্ট্রের কাছে মিনতি না হয়ে দাঁড়ায় এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া।

ইএইচ