শিক্ষকের ওপর ‘মব জাস্টিস’: টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিল চাকসু নেতারা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে আজ এক নজিরবিহীন ও অমর্যাদাকর দৃশ্য অবলোকন করেছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি স্পর্শকাতর দায়িত্ব পালন করতে আসা আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে একদল শিক্ষার্থী শারীরিক হেনস্তা করে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গেছেন। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা নিজেদের নবগঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এর নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: পরীক্ষার হল থেকে ধাওয়া

শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চাকসুর চারজন শীর্ষ নেতার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী অনুষদ ভবনে গিয়ে তাঁর উপস্থিতির প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই শিক্ষক হল থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে শুরু হয় ধাওয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে পেছন থেকে জাপটে ধরে এবং জামার কলার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ছাত্র। এ সময় শিক্ষককে আর্তচিৎকার করতে দেখা গেলেও কেউ তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। পরে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে জোরপূর্বক প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

অভিযুক্তদের পরিচয় ও বক্তব্য

শিক্ষক হেনস্তার এই ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্বে ছিলেন চাকসুর চার নেতা:

১. আব্দুল্লাহ আল নোমান (দপ্তর সম্পাদক)
২. মাসুম বিল্লাহ (পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক)
৩. ফজলে রাব্বি (আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক)
৪. সোহানুর রহমান (নির্বাহী সদস্য)

অভিযুক্ত ছাত্রনেতা ফজলে রাব্বি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, হাসান মোহাম্মদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরাসরি গণহত্যার পক্ষের শক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সহকারী প্রক্টর থাকাকালীন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন। তবে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা ডিনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। আমাদের দেখে তিনি পালানোর সময় গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে পড়ে আঘাত পান। দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানও একই ধরণের দাবি করেছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষকের আর্তনাদ

প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় হাসান মোহাম্মদ রোমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় আমি একদিনের জন্যও রাস্তায় নামিনি বা কোনো দায়িত্বে ছিলাম না। আমি সহকারী প্রক্টর থাকাকালীন কোনো শিক্ষার্থীকে মামলা দেওয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। তিনি আরও জানান, পরীক্ষার হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে তিনি বের হওয়ার চেষ্টা করলেই চাকসু নেতারা তাঁর ওপর হামলা চালায় এবং একটি ‘মব’ তৈরি করে তাকে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করে।

প্রক্টর অফিসে যা ঘটছে: ‘মুঠোফোন তল্লাশি’

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, একজন শিক্ষককে হেনস্তা করে প্রক্টর অফিসে আনার পর সেখানেও তাঁকে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার বদলে এক ধরণের ‘গণতদন্তের’ মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডি ও চাকসু নেতারা যৌথভাবে ওই শিক্ষকের ব্যক্তিগত মুঠোফোন তল্লাশি করছেন বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, হট্টগোলের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। বর্তমানে আমরা ওই শিক্ষকের মুঠোফোন তল্লাশি করছি এবং সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখছি। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত ফোনে ছাত্রদের উপস্থিতিতে প্রক্টরিয়াল বডির তল্লাশি চালানোর বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে শিক্ষক মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী অবস্থান

হাসান মোহাম্মদের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়েছে।

ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেট কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত না করে, ততক্ষণ তিনি আমাদের চোখে শিক্ষক। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও তিনি দায়িত্ব পালনে আইনত যোগ্য। তাই আমরা তাঁকে ডিউটি দিয়েছিলাম।

অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি হয়েছে এবং তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে। তিনি কীভাবে পরীক্ষার ডিউটি পেলেন তা আমার জানা নেই।

সচেতন মহলের উদ্বেগ: শিক্ষা ও সম্মানের মৃত্যু?

ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সামনে একজন শিক্ষককে এভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে অনেকেই ‘শিক্ষকতার পেশার ওপর চরম আঘাত’ হিসেবে দেখছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, “যদি কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ থাকে, তবে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা যদি নিজেরাই পুলিশ, জজ এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করেন, তবে ক্যাম্পাসে আর শিক্ষার পরিবেশ থাকবে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র রাজনীতির যে নতুন মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা আজ এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে বিচারহীনভাবে লাঞ্ছিত করা বা ‘মব জাস্টিস’ করা ওই বিপ্লবের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই নজিরবিহীন শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয় কি না, নাকি ‘তদন্তের’ নামে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

এএন