দীর্ঘ ২৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ ২০ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে নির্বাচন থমকে যাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা। আজ মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনাপূর্ণ।
আজ দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটের দিকে একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম গাড়ি থেকে নেমে নিজ কার্যালয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। বিক্ষোভকারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ‘দালাল দালাল’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। তবে তিনি কোনো মন্তব্য না করে দ্রুত হেঁটে তাঁর কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
শিক্ষার্থীদের স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো ক্যাম্পাস। তারা ‘ক্যাম্পাসের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘হাইকোর্ট না শাকসু, শাকসু শাকসু’, ‘সাস্টিয়ান সাস্টিয়ান, এক হও লড়াই করো’—এমন সব স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত করে তোলেন।
২৮ বছর পর শাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে দুই প্রার্থী ও এক শিক্ষার্থীর করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার হাইকোর্ট নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করার আদেশ দেন। এই খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, নির্বাচন বানচাল করার জন্য এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তারা আইনি জটিলতা কাটিয়ে আজই বা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভোট গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন।
গতকাল সোমবার সকাল সোয়া ১০টা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন তীব্র রূপ নেয় দুপুর সাড়ে ১২টায়, যখন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সহ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা প্রায় সাড়ে ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন।
রাতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রশাসনের দফায় দফায় বৈঠকের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, তারা চেম্বার আদালতে নির্বাচনের পক্ষে লড়াই করবে। এই প্রতিশ্রুতির পর রাত ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন এবং আজকের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক প্রার্থী আরমান হোসেন বলেন, উপাচার্য স্যার আমাদের কথা দিয়েছেন তিনি প্রধান উপদেষ্টা ও শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা আশা করছি চেম্বার আদালত থেকে নির্বাচনের পক্ষে শক্ত রায় আসবে। ততক্ষণ আমাদের অবস্থান চলবে।
‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ (ছাত্রশিবির সমর্থিত) প্যানেলের জিএস প্রার্থী মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, আজ বেলা তিনটায় চেম্বার আদালতে শুনানি হওয়ার কথা। আদালত থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না আসলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
গতকাল বিকেলে শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রশাসনের অনুরোধে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে মেরুকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, কিছু রাজনৈতিক শক্তি পেছন থেকে নির্বাচন বন্ধের কলকাঠি নাড়ছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কর্মসূচির বিপরীতেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ ও দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ভোট গ্রহণের জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। চেম্বার আদালত থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ামাত্রই পরের দিন ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন কমিশন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, শত শত শিক্ষার্থী প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আছেন। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সবার দৃষ্টি এখন চেম্বার আদালতের দিকে। যদি আজ আইনি বাধা না কাটে, তবে শাবিপ্রবি ক্যাম্পাস আরও বড় ধরণের অস্থিরতার দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এএন