একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আভিজাত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় তার জ্ঞানসৃজন ও প্রকাশনার সক্ষমতায়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই চিত্রটি হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এখনো দুইশ পার হতে পারেনি।
দীর্ঘ প্রকাশনা প্রক্রিয়া, সেকেলে মুদ্রণযন্ত্র, দুর্বল বিপণন ব্যবস্থা এবং সংরক্ষণের অভাবে গুরুত্ব হারিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন মৃতপ্রায় সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
বছরে প্রকাশনা মাত্র একটি বা দুটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশনার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে পুরো বছরে মাত্র একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে দুটি এবং ২০২০ সালে একটি বই প্রকাশিত হলেও ২০২১ সালে কোনো বই আলোর মুখ দেখেনি।
ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রকাশনার মাধ্যমেই চেনা যায়। বিশ্ব র্যাংকিং বা বিশ্ব ক্রমে ওপরে ওঠার জন্য গবেষণার পাশাপাশি প্রকাশনাও অপরিহার্য। অথচ আমাদের এখানে চিত্রটি উল্টো।
ইতিহাসের আদ্যোপান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থার ইতিহাস বলছে শুরুর দিকের তিন দশকে অর্থাৎ ১৯২৬ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত মাত্র তিনটি ইংরেজি বই প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর হাত ধরে প্রথমবারের মতো কোনো বাংলা বই প্রকাশিত হয়।
সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে, যার মোট সংখ্যা ৪৮টি। বর্তমানে মোট ১৮৮টি বইয়ের মধ্যে ১১৮টি ইংরেজি এবং ৭০টি বাংলা। বিপরীতে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস বছরে গড়ে ৬ হাজার বই প্রকাশ করে।
প্রকাশনা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক তারিক মনজুর এই স্থবিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, জটিল প্রক্রিয়া। একটি পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পর তা বিশেষজ্ঞের মতামত, সংশোধন এবং প্রশাসনিক ধাপ পার হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়।
দ্বিতীয়ত, প্রচারণার অভাব। এই সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইয়ের কোনো বিপণন বা প্রচার নেই। তৃতীয়ত, আগ্রহহীনতা। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষকরা এখানে পাণ্ডুলিপি জমা দিতে নিরুৎসাহিত হন।
পরিত্যক্ত গুদামে অযত্নে অমূল্য সম্পদ প্রকাশিত বইগুলোর সংরক্ষণ চিত্র আরও ভয়াবহ। ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসির কাছে একটি পরিত্যক্ত ডাকবাংলোকে বর্তমানে গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে গবেষণাধর্মী বইগুলো।
অবাক করার মতো তথ্য হলো প্রকাশিত ১৮৮টি বইয়ের মধ্যে অনেকগুলোর মূল কপিই এখন আর সংস্থার সংগ্রহে নেই। অধ্যাপক তারিক মনজুর স্বীকার করেন বই সংরক্ষণের কোনো আধুনিক পদ্ধতি তাঁদের নেই।
সেকেলে মুদ্রণ ও আধুনিকায়নের প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মুদ্রণালয় থাকলেও তা গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে প্রকাশনা সংস্থার কোনো বই ছাপেনি। মুদ্রণালয়ের ব্যবস্থাপক এস এম বিপাশ আনোয়ার জানান প্রেসটি আধুনিক করা গেলে বাইরের ওপর নির্ভরতা কমত।
সংস্থাটিকে গতিশীল করতে অধ্যাপক তারিক মনজুর কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পাণ্ডুলিপি বাছাইয়ের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ছোট কমিটি গঠন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব জার্নাল বা সাময়িকী ও ম্যাগাজিনকে একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার অধীনে আনা।
এছাড়া পরিত্যক্ত ডাকবাংলোটি সংস্কার করে সেখানে বুক ক্যাফে বা আধুনিক বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাবে। যথাযথ বাজেট, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনই পারে এই সংস্থাকে পুনরায় প্রাণবন্ত করতে।
জেএইচআর