জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিক্ষা খাত। দেড় দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল দেশবাসী। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষলগ্নে এসে পেছনে তাকালে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা খাতে সংস্কার তো দূরের কথা, রুটিন মাফিক প্রশাসনিক কাজগুলো সম্পন্ন করতেই হিমশিম খেয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সিদ্ধান্তহীনতা, নেতৃত্বহীনতা এবং পরিকল্পনার অভাবে শিক্ষা খাতের ব্যর্থতার পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে।
বিগত দেড় দশক ধরে জানুয়ারির প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া ছিল একটি জাতীয় ঐতিহ্যের মতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে এই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ পড়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৮৬ লাখ বই এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। এনসিটিবি ১৫ জানুয়ারির ডেডলাইন দিলেও তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। গত বছরও বই সরবরাহ শেষ করতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। রুটিন কাজ হিসেবে পরিচিত বই ছাপানো ও বিতরণে এই দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
সরকার পরিবর্তনের পরপরই সচিবালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল এবং ‘ভিন্ন পদ্ধতিতে’ ফলাফল প্রকাশের সিদ্ধান্তটি ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একদল শিক্ষার্থীর অযৌক্তিক দাবির মুখে নতি স্বীকার করা শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড দুর্বল করে দিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাঙ্গনে বেড়েছে ‘মব’ জাস্টিস বা গণ-হেনস্তা। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করার ঘটনাগুলো শিক্ষা পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। শিক্ষকদের ওপর এই মানসিক চাপ ও প্রশাসনিক অস্থিরতা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সাধন করছে।
সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দায়িত্ব নিয়েই বিতর্কিত নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে এসে পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন অনেকেই একে ইতিবাচক বললেও, এরপর বিকল্প কোনো শক্তিশালী রূপরেখা তৈরি করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) ২০২৭ সাল থেকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম চালুর কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর কমিটি বা খসড়া রূপরেখা তৈরি হয়নি। বিশ্ব যখন প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশ তখন পুরোনো কাঠামোর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
শিক্ষা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) গত বছরের অক্টোবর থেকে নিয়মিত মহাপরিচালক ছাড়াই চলছে। শুধু মাউশি নয়, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর মতো সংবেদনশীল সংস্থাগুলোতেও দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষ পদগুলো শূন্য অথবা রুটিন দায়িত্বে চলছে। এই নেতৃত্বহীনতা সংস্থাগুলোর কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি করেছে।
ঢাকার বড় সাতটি সরকারি কলেজ নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করার ঘোষণা দিলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো বা অধ্যাদেশ এখনো ঝুলে আছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ বাড়ছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের উদ্যোগটিও কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
বেসরকারি এমপিওভুক্ত ৬ লাখেরও বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আবেদন স্তূপ হয়ে আছে। ২০২১ সালের পর থেকে অনেকে আবেদন করেও টাকা পাচ্ছেন না। অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানো হলেও তার কোনো সুরাহা হয়নি। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ বোর্ড পর্যন্ত গঠন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তবে কিছু ছোটখাটো অর্জনও রয়েছে। প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আটকে থাকা পদোন্নতির মতো কিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে করার উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ মনে করেন, এই সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা ছিল, যা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, সব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা হয়তো এই সরকারের ছিল না, কিন্তু শিক্ষা নিয়ে একটি সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি পথনকশা বা রোডম্যাপ তৈরির সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবে শিক্ষাকে আমরা কখনোই অগ্রাধিকার দিতে পারিনি, যা বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসার আগেই শিক্ষা খাতের এই পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সংস্কারের কথা বলে আসা এই সরকার শিক্ষা খাতের রুটিন কাজগুলোতে ব্যর্থ হয়ে একটি অগোছালো উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে। ফলে আগামীর শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
এএন