ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়াম এলাকায় বহিরাগত কিশোরদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। পরপর দুই দিন দুটি ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর আজ সোমবার তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
রোববার প্রথম একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে খেলতে আসা বেশ কয়েকজন কিশোরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে কান ধরিয়ে ওঠবস করাচ্ছেন সর্বমিত্র চাকমা। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আজ সোমবার আরও একটি ভিডিও জনসমক্ষে আসে। দ্বিতীয় ভিডিওটিতে দেখা যায়, হাতে একটি লাঠি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে পায়চারি করছেন তিনি এবং সেখানে থাকা কিশোর-তরুণদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওঠবসের সংখ্যা গুনছেন।
ছাত্রপ্রতিনিধি হয়েও এমন ‘অপেশাদার’ ও ‘অমানবিক’ আচরণের ছবি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও নেটিজেনরা। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, বহিরাগত সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব প্রশাসনের, কোনো ব্যক্তি বা ছাত্রনেতার এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়।
বিতর্ক চরমে পৌঁছালে আজ দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন সর্বমিত্র চাকমা। সেখানে তিনি তাঁর আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
তিনি লেখেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আমি বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে তাদের কান ধরে ওঠবস করাতে বাধ্য হই। এটি কোনোভাবেই আমার প্রত্যাশিত বা কাম্য আচরণ ছিল না। আমি স্বীকার করছি—এভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া আমার উচিত হয়নি এবং এই ঘটনার জন্য আমি নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
নিজের আচরণের জন্য ক্ষমা চাইলেও এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে কাঠগড়ায় তুলেছেন এই ডাকসু নেতা। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশের ফলে ক্যাম্পাস অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, মোবাইল ফোন ও সাইকেল চুরির মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। বারবার প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো দৃশ্যমান প্রতিকার না পাওয়ায় তিনি নিজেই ব্যবস্থা নিতে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন, আমি সে প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হইনি। প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়েই আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
উল্লেখ্য, সর্বমিত্র চাকমা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে হওয়া ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, "বহিরাগত সমস্যা একটি বড় সমস্যা ঠিকই, কিন্তু একজন ডাকসু নেতার হাতে লাঠি মানায় না। এটি আমাদের ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই অনেক সময় শিক্ষার্থীদের এমন উগ্র পদক্ষেপ নিতে হয়।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাঁর এই পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত ঢাবি প্রশাসন বা ডাকসুর উচ্চপর্যায় থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।
এএন