বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও হল সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচন প্রথম তফসিল অনুযায়ী গত ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও জানুয়ারিতেও অনুষ্ঠিত হয়নি। স্থগিত হয়েছে পর পর পাঁচটি তফসিল। ফলে ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং সর্বশেষ টানা ৫৯ ঘণ্টা আমরণ অনশনের পর গত ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষার্থী সংসদ যুক্ত করা হয়।
এরপর মঙ্গলবার ৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৬তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমানকে প্রধান কমিশনার করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট ব্রাকসুর প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। তবে একদিন পরই প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদ থেকে প্রথম দফায় পদত্যাগ করেন তিনি। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ব্রাকসু নির্বাচন। এরপর তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার না দিয়ে, তাঁকে রাজি করানোর নামে সময় ক্ষেপণ শুরু করেন উপাচার্য। উপাচার্য কয়েক দফা কথা বলেন প্রফেসর ফেরদৌস রহমানের সঙ্গে। উপাচার্যের সব আলোচনা উপেক্ষা করে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ১০ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রফেসর ড. ফেরদৌস রহমান। প্রথম নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ জটিলতার কারণে ৫ নভেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত স্থবির হয়ে যায় ব্রাকসু নির্বাচনের কার্যক্রম।
পরে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ১১ নভেম্বর বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১১৭তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট কমিশন পুনর্গঠন করা হয়।
কমিশন পুনর্গঠন হলেও কমিশনকে কার্যত নীরব ভূমিকায় দেখা যায়। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১৮ নভেম্বর তড়িঘড়ি করে ২৯ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে ব্রাকসুর প্রথম তফসিল প্রকাশ করা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে একদিন পরই (২০ নভেম্বর) ভোটগ্রহণের তারিখ পরিবর্তন করে ২৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করে দ্বিতীয় তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৫ নভেম্বর পুনর্গঠিত কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান পারিবারিক ব্যস্ততা দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদনপত্র জমা দেন। ফলে আবার ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে প্রশাসন অব্যাহতি না দিলে পরবর্তীতে প্রশাসনের অনুরোধে তিনি ৩০ নভেম্বর আবার নিজের দায়িত্বে ফেরেন অধ্যাপক শাহজামান।
এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শাহজামান দায়িত্বে ফেরার একদিন পর ১ ডিসেম্বর বিকেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকায় অসঙ্গতির কথা জানিয়ে এবং সঠিক ভোটার ও শিক্ষার্থী তালিকা সরবরাহ না করার জন্য রেজিস্ট্রার দপ্তরকে অভিযুক্ত করে নির্বাচন কমিশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্রাকসুর সব কার্যক্রম স্থগিত করে। তবে নিয়ম অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরি করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রার জানান, “রেজিস্ট্রার দপ্তর ভোটার তালিকা প্রদান করে না। রেজিস্ট্রার দপ্তর নির্বাচন কমিশনকে শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রদান করে। আর এই শিক্ষার্থী তালিকা তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখা ও সিডিটি শাখা। রেজিস্ট্রার দপ্তর কেবল সমন্বয়ের কাজ করে।”
নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী জানান, “নির্বাচন কমিশন স্বাধীন।” তবে সূত্র জানায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেই সংবাদ সম্মেলনে এসে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছেন। নির্বাচন স্থগিত হলে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে উপাচার্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সিডিটিকে সঠিক শিক্ষার্থী তালিকা সরবরাহের নির্দেশ দেন। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ৩ ডিসেম্বর রাতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী সংশোধিত তৃতীয় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
তফসিল অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন, ডোপ টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহসহ সব কার্যক্রম সম্পন্ন করলেও মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন (৯ ডিসেম্বর) কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই কার্যত উধাও হয়ে যায় নির্বাচন কমিশন। ফলে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। এতে প্রার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।
পরে ১০ ডিসেম্বর রাতে আবারও তফসিল পরিবর্তন করে ২৪ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে চতুর্থ তফসিল প্রকাশ করা হয়। এর পরদিন রাতে ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান দ্বিতীয়বারের মতো পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চূড়ান্ত পদত্যাগ করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ বিষয়ে ১২ ডিসেম্বর জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে ১৩ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, “এ বিষয়ে আমি অবগত নই। আমি এখন আপনাদের কাছ থেকে শুনছি।”
চতুর্থ তফসিল অনুযায়ী ১৩ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যতীত বাকি পাঁচ কমিশনারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে জানানো হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত নির্দেশনা বা দায়িত্ব অর্পণ ছাড়া খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশসহ গুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা আইনসম্মত নয়। ফলে নির্ধারিত খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশে সাময়িক বিরতি রাখতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন।
দ্বিতীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের ১২ দিন পরও নতুন কমিশনার না পেয়ে ২৪ ডিসেম্বর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভ প্রকাশ করলে ছুটির (২৫ ডিসেম্বর–১০ জানুয়ারি) মধ্যে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার দেওয়ার আশ্বাস দেন উপাচার্য। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অধ্যাপক রাজি না হওয়ার অজুহাত দেখানো হয়। যদিও ব্রাকসু বিধিমালা অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক থেকেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
এরপর ১১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে উপাচার্য সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ রানাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেন এবং নির্বাচন কার্যক্রম পুনরায় চালুর নির্দেশ দেন।
পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী ১৩ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও তা না করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার অজুহাতে রাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পঞ্চমবারের মতো ব্রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এরপর ১৭ জানুয়ারি রাতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিলে পরদিন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দেন উপাচার্য। তবে এ বিষয়ে পরবর্তীতে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, “উপাচার্য ও তাঁর প্রশাসন নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন দেয়নি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বিভিন্ন সময়ে বলেন, “তিনি এবং তাঁর প্রশাসন ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক এবং চেষ্টার কোনো কমতি নেই।”
উল্লেখ্য, সরেজমিনে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছাড়া ব্রাকসুর কোনো কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন হয়নি। এমনকি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছাড়া উপাচার্য কোনো প্রধান নির্বাচন কমিশনারও দেননি।