শিক্ষামন্ত্রী

পরীক্ষার হল থেকে বাতিল হচ্ছে ‘নীরব বহিষ্কার’

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ছবি শিক্ষামন্ত্রীর ফেসবুক থেকে

বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষার ইতিহাসে এক দীর্ঘদিনের ভীতি ও বিতর্কের নাম ‘নীরব বহিষ্কার’ বা ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই বিতর্কিত প্রথাটি অবশেষে চিরতরে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আজ শনিবার সচিবালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় এই ঘোষণা দিয়েছেন। 

মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, পরীক্ষার হলে কোনো শিক্ষার্থীকে অজান্তে বা গোপনে শাস্তির আওতায় রাখা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নীতিমালা পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত পাবলিক পরীক্ষায় কোনো পরীক্ষার্থী নকল করলে বা অসদুপায় অবলম্বন করলে তাকে হাতেনাতে ধরে খাতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু ‘নীরব বহিষ্কারের’ ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলে কিছু জানানো হয় না। তিনি স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু পরিদর্শক বা হল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর অজান্তেই তার উত্তরপত্রের ওপর ‘বহিষ্কার’ সংক্রান্ত বিশেষ চিহ্ন বা মন্তব্য লিখে দেন। ফলাফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থী দেখতে পান তার ফল স্থগিত বা তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।

এই পদ্ধতিটিকে বছরের পর বছর ধরে 'মানবিক' বলা হলেও, শিক্ষাবিদ ও মনস্তাত্ত্বিকরা একে 'মানসিক নিষ্ঠুরতা' হিসেবে অভিহিত করে আসছিলেন। কারণ, একজন শিক্ষার্থী ফলাফল প্রকাশের দিন পর্যন্ত জানতেনই না যে তার সারা বছরের পরিশ্রম পণ্ড হয়ে গেছে।

শনিবার সচিবালয়ে মাধ্যমিক (এসএসসি) ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রী এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান। সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা সরাসরি ও ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, পরীক্ষাসংক্রান্ত কোনো বিধিতে ‘আনডিউ’ বা অযৌক্তিক কিছু থাকতে পারে না। ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইনেও এমন কোনো বিধান নেই যা গোপনে কাউকে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে। অথচ ১৯৬১ সালের একটি পুরনো নীতিমালার দোহাই দিয়ে এই ধারাটি এতদিন টিকে ছিল। আধুনিক বাংলাদেশে এই এনালগ এবং অস্বচ্ছ নিয়ম আর চলতে পারে না। কেন এই পরিবর্তন?

মন্ত্রী তার বক্তৃতায় নীতিমালা পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ তুলে ধরেন। 

স্বচ্ছতার অভাব: শাস্তির প্রক্রিয়া সবসময় প্রকাশ্য হওয়া উচিত। একজন শিক্ষার্থী অপরাধ করলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে অথবা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

মানসিক প্রভাব: নীরব বহিষ্কার’ একজন শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম আঘাত হানে। ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত মিথ্যা আশায় থাকা এবং হঠাৎ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়া আত্মহত্যার মতো ঘটনাকেও উসকে দিতে পারে।

আইনি সীমাবদ্ধতা: ১৯৬১ সালের প্রবর্তিত এই নীতিমালা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অচল। ১৯৮০ সালের মূল আইনের সঙ্গে এর সাংঘর্ষিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

কঠোর নিরাপত্তা: মন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমানের পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কঠোরতার কারণে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা গণ-নকলের সুযোগ নেই। তাই গোপন শাস্তির প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর এই নির্দেশনার পর শিক্ষা বোর্ডগুলো এখন নীতিমালা সংশোধনের কাজ শুরু করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষা থেকেই এই নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। রাজধানীর একটি কলেজের শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, নীরব বহিষ্কার ছিল একটা আতঙ্কের নাম। অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির কারণেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর খাতার কোণায় কিছু লিখে দিতেন, যা বাচ্চার জীবন ধ্বংস করে দিত। এখন অন্তত সব স্বচ্ছ হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে পরীক্ষা হলের কক্ষ পরিদর্শকদের দায়িত্বশীলতা আরও বাড়বে। যদি কোনো শিক্ষার্থী অনিয়ম করে, তবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অবহিত করতে হবে, যা শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী কেবল নীতিমালা পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং আসন্ন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা যেন উৎসবমুখর পরিবেশে এবং কোনো প্রকার প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছাড়াই সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থী যেন অহেতুক ভীতি অনুভব না করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না।

১৯৬১ সালের সেই ব্রিটিশ-উত্তর মানসিকতার ‘নীরব বহিষ্কার’ প্রথার অবসান বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি কেবল একটি নিয়মের পরিবর্তন নয়, বরং শিক্ষার্থীর অধিকার ও বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

এম জি